BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

বাবরি মসজিদ তখনও ভেঙে পড়েনি। ভাঙবার তোড়জোর চলছে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে।

১৯৯০-এর দশকের গোড়ার কথা। বাবরি মসজিদ তখনও ভেঙে পড়েনি। ভাঙবার তোড়জোর চলছে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে। উত্তর প্রদেশের বেনারস থেকে লক্ষ্ণৌ যাওয়ার তিনটি রেলপথের একটিতে, সুলতানপুর স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে কিলোমিটার পাঁচেক উত্তর-পূর্ব কোণে গেলে একটা গ্রাম পড়ে। সারন। মূলত অনুসূচিত জাতির মানুষদের বাস। সেই গ্রামে ১৯৯১ সালে এক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতার আগমন হয়, দলিতদের মধ্যে রামমন্দিরের পক্ষে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে।

তিনি সেই গ্রামের কয়েকশ মানুষের সঙ্গে বৈঠকে বসে প্রথমে সকলের শুভ নাম জানতে চান। স্বভাবতই বেশ কিছু নাম এসে পড়ে এই রকম: রামনরেশ, রামভক্ত, রামপ্রসাদ, রামপ্রকাশ, রামকিষেন, রামনারায়ণ, রামজিত, রামপ্রীত, রামসুন্দর, রামধন, রামকুশল, সীতারাম, ভগতরাম, জগতরাম, . . . ইত্যাদি। আরও অনেক রাম-হীন নামও সেখানে ছিল, যেমন মহেশ যাদব, কিশোর সিং, যুগল প্রসাদ, ইন্দারজিত, ইত্যাদি। কিন্তু সেই নেতা সেই সবের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে এই রাম-পৃক্ত নামগুলি আঁকড়ে ধরে এক গম্ভীর বাণী দিলেন: “জিস রামজি কে নাম হমারে সাথ জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে জীবন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে খান-পান সে হমারে রহন-সহন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, না জানে কিতনে দিনোঁ সে, ওহ নাম কো ক্যায়া হম ভুল যা সকতে হ্যাঁয়? উস পবিত্‌র্‌ নাম সে জুড়ে মন্দির হমে নহি চাহিয়ে? আপ কা ক্যায়া রায় মুঝে জরা বতানা।” বলাই বাহুল্য, সেই গ্রামের সেই বৈঠকে উপস্থিত সমস্ত জনতাই সাগ্রহে রামের নামাঙ্কিত মন্দির নির্মাণে সায় দিয়েছিল। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা ভাবলেন, তাঁর আসা সার্থক হল।

এদিকে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং সরকারের তরফে সেই সময়েই মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ বেরিয়েছে। তা নিয়েও চারদিকে হই-চই হচ্ছে। কাঁশিরাম (আবার রাম!) মায়াবতী প্রমুখর অভ্যুত্থান হচ্ছে। তাঁরা আবার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, যাতে সাধারণ দলিত বর্গের মানুষজন রামমন্দিরের হুজুগে গিয়ে না ভিড়ে পড়ে। সুতরাং তাঁদেরও এক নেতা একেবারে সেই সারন গ্রামেই এসে হাজির হলেন। যারা নিয়ে এসেছে, তারা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতার বিগত সভার সাফল্যের কথাও বলে দিয়েছে। সুতরাং তিনিও বাগ্‌বিস্তারে সেই একই পদ্ধতিতে এগোতে চাইলেন। উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলির সকলের নামধাম শোনার পর রামবিহীন নামগুলিকে অগ্রাহ্য করে তিনি বললেন: “জিস রাম কে নাম হমারে সাথ জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে জীবন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে পহচান সে মিলে হ্যায়, না জানে কিতনে দিনোঁ সে, উস নাম সে হমে ক্যায়া মিলা? হমারে খান-পান মে হমারে রহন-সহন মে উস সে ক্যায়া মিলা? নফরত, ঘ্‌রুণা, জীবনভর অবহেলনা, অওর ক্যায়া? তো উস নাম সে হমারা দলিতোঁ কা ক্যায়া লেনাদেনা? উস নাম সে জুড়ে মন্দির হমে কিউঁ চাহিয়ে, জহাঁ হমে ওহ লোগ শায়দ চঢ়নে ভি নহি দেঙ্গে? আপ কা ক্যায়া রায় মুঝে জরা বতানা।” আবারও বলাই বাহুল্য, উপস্থিত সকলেই এক বাক্যে জানাল, সেরকম মন্দিরে তাদের কোনোই আগ্রহ নেই। কাঁশিরামপন্থী নেতা তৃপ্তিসহ ভাবলেন, তাঁরও আসা সার্থক হয়েছে।

বিশ্বের বিচিত্র জটিল ঘটনাচক্রে এর কিছু দিন পর, ১৯৯১ সালের বোধ হয় ডিসেম্বরের দিকে, এই অধমেরও ঠিক সেই গ্রামেই পদার্পণ ঘটে। সেখানে একটি ঘরোয়া সভায় উপস্থিত মানুষেরা দুটো ঘটনাই আমাকে সবিস্তারে জানান। এবং মজার কথা হল, এবার তাঁরা আমার এই ব্যাপারে রায় কী জানতে চান। বলা বাহুল্য, আমার পক্ষে সেই রাম-নাম মাহাত্ম্য নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে খেলা করা সম্ভব ছিল না। পরিস্থিতির গুরুত্বের কথা ভেবে আমি সেদিনের সেই গ্রামীন ঘরোয়া বৈঠকে বেশ কিছু কথা বলেছিলাম, সহজ সরল ভাষায়; এখানে সেই কথাগুলোই একটু শহুরে রঙিন সংলাপে তত্ত্বের আকারে তুলে ধরতে চাই। হয়ত মাঝখানে গত প্রায় তিন দশকে এসে যাওয়া নতুন কিছু তথ্য অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান যোগ করে।

[২] অন্দর মহলে উঁকি

আজ সারা ভারতবর্ষ জুড়ে যেভাবে বিজেপি-র দাপট ও প্রভাব বাড়ছে, যেভাবে তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের বক্তব্যকে চাড়িয়ে দিতে পারছে, তাতে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বহু মানুষই উদ্বিগ্ন বোধ করছেন। এই যে কখনও পাকিস্তান, কখনও কাশ্মীরের বিরুদ্ধে জিগির তুলে, কখনও দেশপ্রেমের বুলি আউড়ে, কখনও পাকিস্তান-বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সত্য মিথ্যা কাহিনির গুঞ্জন ছড়িয়ে, আবার কোনো সময় সরাসরি মুসলিম বিরোধী বিষোদ্গার করে দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষকে তারা খেপিয়ে তুলছে—এটা তারা করতে পারছে কেন? আমার ধারণা, এই জায়গাটা মার্ক্সবাদী বা বামপন্থী বলে পরিচিত দলগুলো, তাদের নেতা ও কর্মী, এমনকি তাদের আশেপাশে থাকা বুদ্ধিজীবীদেরও অনেকেই ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছেন না। তার ফলে তাদের কাজ কী, কীভাবে এই বিপদের মোকাবিলা করবেন, তাও তাঁরা ভেবে পাচ্ছেন না!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button