BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের সংজ্ঞা ও আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারেও দু-চার কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন

আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই সুবিধাটা পাওয়ার উপায় নেই। ভারতীয় বুর্জোয়াদের কিছু ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতার কারণে ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডলে এখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলন তথা রেনেশাঁস আন্দোলন যতটুকু হয়েছে তা দেশের দু তিনটে মাত্র পকেটে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। তার উত্তাপ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কম-বেশি গেলেও তার আলো প্রায় কোথাওই খুব একটা যায়নি। আবার ইউরোপের তুলনায় এই দেশের রেনেশাঁস ছিল নানা দিক থেকে খুবই দুর্বল, জমি এবং জমিদারির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে চলার কারণে সামন্ততান্ত্রিক কু-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বহু কথাই সে খুব জোর গলায় বলতে পারেনি। যেটুকু বলতে শুরু করেছিল, তাকেও খুব তাড়াতাড়ি রক্ষণশীলরা নানা মাত্রায় বিরোধিতা করে অথবা প্রাচীন সংস্কারের খাদ মিশিয়ে অনেকখানি পানসে করে দেয়। ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংগ্রামেরও একই সমস্যা। সেখানেও বুর্জোয়াদের সেই অংশটাই নেতৃত্ব দিয়েছে যারা ছিল মূলত রক্ষণশীল, সমস্ত প্রগতিশীল ধ্যান ধারণা মূল্যবোধের স্বাঙ্গীকরণে অপারগ, বা অনিচ্ছুক। ফলে, এখানে কমিউনিস্টদের সংস্কৃতি কর্মীদের এবং তাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মকর্তাদের এমন অনেক বিষয় উত্থাপনের দায় ছিল যা আসলে অপূরিত বুর্জোয়া বিপ্লবেরই সার কথা। এ কাজগুলি তাঁরাও শেষ অবধি সাহস করে না করায়—এমনকি করতে যে হবে তাও না বোঝায় (কেউ কেউ উলটে রেনেশাঁসের অর্জিত সামান্য ফসলটুকুকেও অস্বীকার ও আত্মস্থ করার এক মেকি-বিপ্লবীয়ানায় ফেঁসে যাওয়ার ফলে)—সমাজ জীবনে একটা বড় ফাঁক থেকে গেছে, যা সহজেই বর্তমান কালের প্রতিক্রিয়াশীলরা তাদের বস্তাপচা আদিম ও মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা দিয়ে ভরাট করে দেবার সুযোগ পেয়ে গেছে। সেই পাপেরও মূল্য আজ আমাদের কড়ায়-গণ্ডায় চুকাতে হচ্ছে।

২০১৪ সালে বিজেপি-র কেন্দ্রীয় সরকারে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়া, এবং, বিশেষ করে, আরএসএস পরিবারের গুড-বয়, গুজরাতের শতাব্দকালের ভয়াবহতম মুসলিম নিধন যজ্ঞে হাত পাকানো, নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসার কাছাকাছি সময় থেকে এই সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা আমাদের দেশের বুকে নতুন করে তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। [Bhattacharya 2014] এটাও লক্ষণীয়, যখন যেখানেই নির্বাচনের ঢাক বেজে উঠেছে, সেখানেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিজেপি-র লোকেরা দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছে। লোকসভা এবং উত্তরপ্রদেশের বিধানসভার নির্বাচনের প্রাক্কালে ওরা মেরাত মোরাদাবাদ ইত্যাদি জায়গায় মুসলিম বসতির উপরে বেশ ভালো রকম হামলা চালিয়েছে। দিল্লিতে যখন বিধানসভা ভোট আসন্ন, সেখানেও ওরা একবার দাঙ্গা বাধিয়ে বসেছিল। পশ্চিম বাংলায় বিগত বিধানসভার ভোটের প্রাক্কালেও ওরাও বাজারে নেমে পড়েছিল এবং নানা রকম পরিকল্পনা করেই এগোচ্ছিল, যাতে পুরোদস্তুর দাঙ্গা-হাঙ্গামা যদি নাও লাগানো যায়, অন্তত ভোটদাতাদের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দ্রুত ঘটতে থাকে ও উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডকে কেন্দ্র করে সেই সময় ওরা কীভাবে ঘুঁটি সাজিয়ে এগিয়েছিল, এন-আই-এ-কে দিয়ে কীভাবে একটা জবরদস্ত মুসলিম জঙ্গি চক্রের অস্তিত্ব-কাহিনি তৈরি করে ফেলেছিল, যার মধ্যে এই অপপ্রয়াসের সমস্ত লক্ষণই বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল, এতদিনে সকলেই জেনে গেছেন! [Mirsab 2014; Shahi 2014]

নরেন্দ্র মোদীর সরকার কিছুদিন বিকাশ টিকাশের কথা বলে নিজেদের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী পরিচিতিকে সরিয়ে রেখে একটা শক্ত সমর্থ কাজের দল হিসাবে আসতে চাইলেও, একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে নিতে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ঠুনকো জনপ্রিয়তা দ্রুত হারাতে থাকার ফলে অচিরেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের চাপে বিজেপি আবার তার স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে ফেলেছে। গরু এবং গোমাংস নিয়ে দেশ জুড়ে একটা হইচই বাধিয়ে তুলে যত্রতত্র গোমাংসের খোঁজে এবং গন্ধে নিরীহ মুসলিম জনসাধারণের উপর হামলা চালাতে শুরু করে দেয়। একই সঙ্গে চলতে থাকে দলিত সম্প্রদায়ের উপরেও হামলার সিরিয়াল। যেহেতু হিন্দু হিসাবে ধরলে, তারাই সংখ্যায় বিপুল বৃহত্তর অংশ, এক্ষেত্রেও লক্ষ্য হল, ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন ধরিয়ে তাদেরকে ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য ও বিজেপি-আরএসএস মার্কা হিন্দুত্বকে মেনে নিতে বাধ্য করা। আর এই প্রক্রিয়ায় দেশের বুকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে জ্বালিয়ে রাখা।

[৩] ভ্রম নিরসন

প্রথমে আমি এখানে কিছু সাধারণ বিষয় তুলে ধরতে চাই। অনেকেই মনে করেন, আমরা বামপন্থীরা, মার্ক্সবাদীরা, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের পক্ষের মানুষেরা ভারতে শুধুমাত্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই সোচ্চার; মুসলিম জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমরা নাকি কখনই মুখ খুলি না। সমালোচনা করি না। কথাটা সঙ্ঘ পরিবারের তরফে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা প্রচার এবং সাধারণে প্রচলিত একটি আগাপাশতলা ভুল ধারণা। এই মিথ্যা এবং ভুল চিনবার জন্য বিপরীত দিক থেকে একজন মুসলিম মৌলবাদীর সঙ্গে কথা বলে দেখুন। সাড়ে তিন সেকেন্ডের মধ্যেই টের পেয়ে যাবেন, বামপন্থী, মার্ক্সবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদীদের চেয়ে বড় শত্রু তাদের কাছেও আর কেউ নেই। তারাও বরং হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদেরই অনেক বেশি আপনজন বলে মনে করে। বন্ধুভাবে দেখে।

কেন?

দুটো অনিবার্য কারণে।

এক, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী জঙ্গিপনা দেখানোর তালি বাজানোর ক্ষেত্রেও এক হাতে কাজ হয় না। দুই হাত লাগে। সেখানে এরা একে অপরের তালির কারণ এবং কার্য হিসাবে কাজ করতে পারে। এ ওকে দেখায়, ও একে দেখায়। দু পক্ষেরই দু পক্ষকে প্রয়োজন। এক পক্ষ আর এক পক্ষের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে। এই কথাটা দুনিয়া জুড়েই সত্য। যেখানে ইহুদি জঙ্গিপনা আছে, সেখানেই ইসলামিক জঙ্গিরাও আছে। হিটলারের খ্রিস্টীয় সন্ত্রাসই ইহুদি সন্ত্রাসীদের জন্ম দিয়ে গেছে। এ প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে সর্বজনীন সত্য। অতএব ভারতেও শুধু হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা আছে, মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা নেই—একথা বলার বা মনে করার কোনো কারণই নেই। এটা বাস্তবে সম্ভবই নয়।

দুই, সমস্ত জঙ্গিবাদেরই একেবারে প্রথম প্রয়োজন যুক্তিবাদের বিনাশ। শ্রেণিচেতনার ধ্বংসসাধন। মানুষ যদি স্বাধীনভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে, প্রশ্ন তোলে, যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে সমস্ত জিনিস বুঝতে চায়, সাধারণ মানুষ যদি তার শ্রেণিস্বার্থের কথা ভাবতে থাকে, ধর্মীয় মৌলবাদের পক্ষে তার চেয়ে সর্বনেশে কীটনাশক আর কিছু হয় না। তার সমস্ত জারিজুরি, সমস্ত জোর, মানুষকে বিভ্রান্ত করার সমস্ত কলকাঠি নিমেষে হাতছাড়া হয়ে যাবে। সুতরাং, আরএসএস যখন যুক্তিবাদকে ধ্বংস করে, শ্রেণিগত ঐক্যের বদলে ধর্মীয় ঐক্যের শ্লোগান দেয়, সে শুধু হিন্দুদেরই যুক্তিবোধ কেড়ে নেয় না, একই সঙ্গে মুসলিম আম জনতারও বিচারবুদ্ধিকে খতম করে দেয়। সে এটা চায় কিনা, ভেবেচিন্তে করে কিনা বড় কথা নয়। যা সে করে তার পরিণাম এটাই। পক্ষান্তরে, মুসলিম মৌলবাদীরাও যা করে তাতে সাড়া দিতে গিয়ে শুধু সাধারণ মুসলিম নয়, একই সঙ্গে হিন্দু জন সাধারণও যুক্তি হারিয়ে মনের ঝাল মেটাতে থাকে। এইভাবে দুই পক্ষই দুই পক্ষকে শক্তি ও ন্যায্যতা যোগাতে থাকে এবং পারে। দু পক্ষেরই টিকে থাকতে গেলে একে অপরকে প্রয়োজন।

এই কারণেই আমরা যখনই যুক্তি দিয়ে তথ্য দিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে বিচার করি, তাতে শুধু হিন্দুত্ববাদীদের নয়, মুসলিম জঙ্গিদেরও গায়ে ফোস্কা পড়ে। বিপরীতভাবে আপনি যদি মুসলিম মৌলবাদকে যুক্তিপূর্ণভাবে বিচার করতে চান, আরএসএস পন্থীরা তাতেও বাধা দেবে। তারাও চেষ্টা করবে আপনাকে যুক্তির বাইরে টেনে নিয়ে যেতে। কিছু বাজে কূটতর্কে আপনাকে ফাঁসিয়ে দিতে চেষ্টা করবে।

এখানে একটা উদাহরণই সকলের চোখ খুলে দেবে। অনেকেই লক্ষ করেছেন, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলন যখন একাত্তরের ঘাতকদালালদের নির্মূল করার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, এই দেশের বামপন্থী মার্ক্সবাদী যুক্তিবাদীরা দু হাত তুলে বিপুল উৎসাহে তাকে সমর্থন জানিয়েছে, তার সাথে একাত্মতা জ্ঞাপন করেছে। সে তো ঘোষিতভাবেই ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মের এক বিশাল গণঅভ্যুত্থান। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান-ধারণার বিরুদ্ধে ভাষা-ভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাকে লালনের সপক্ষে এক বিশাল ঊর্মিমালা। কিন্তু এই দেশে শুধু ইসলামি সংগঠনগুলি নয়, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলিও তার সপক্ষে একটি বাক্যও ব্যয় করেনি। কেন? কেন না তারাও বোঝে, বাংলাদেশের জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন তার প্রকৃত অভিমুখ শেষ বিচারে তাদেরও বিরুদ্ধেই যাবে। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে ভাষার স্বাধিকারের দাবি, ধর্মের ভিত্তিতে নয় ভাষার ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের দাবি, যে তাদের “হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান”-এর বহু-উচ্চারিত একরেখ কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, এইটুকু বুদ্ধি তাদেরও আছে।

দু নম্বর কথা হচ্ছে, বিশ্ব-প্রেক্ষিতে ধরলে ইসলামি সন্ত্রাস যে একটা বিরাট সমস্যা—তা নিয়ে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই। বিশেষ করে মধ্য প্রাচ্যে, তালিবান, আল কায়দা, আইসিস, ইত্যাদি নানা নামের যে সমস্ত সংগঠনগুলি কাজ করছে তারা মানবতার পক্ষে এক ভয়াবহ বিপদ। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের সাপেক্ষেও, মুসলিম জনসংখ্যার বিপুলাধিক্যের কারণে ইসলামি সন্ত্রাসই সেসব দেশে মারাত্মক বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আবার হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদের কোনো গুরুত্বই নেই। কিন্তু আমরা যখন ভারতের প্রেক্ষিতে আলোচনা করছি, তখন দেখতে হবে, এই মুহূর্তে ভারতের সামাজিক রাজনৈতিক মঞ্চে বড় বিপদ কোত্থেকে আসছে? ইসলামি সন্ত্রাসই যদি দেশের সামনে বেশি শক্তি এবং মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হত, তাহলে তো এতদিনে যেখানে সে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় সেই কাশ্মীর থেকেই ভারতের পাততাড়ি গুটিয়ে চলে আসার কথা। বরং এখন পর্যন্ত তা যে ঘটেনি তাতেই বোঝা যায়, এই সন্ত্রাসের শক্তি এখনও বৃহত্তর বিপদ নয়।

কথাটা বোঝার জন্য আর একটা ছোট অথচ সহজদৃশ্য উদাহরণ দিচ্ছি। আগের ছয় বছরের অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি শাসন ভারতের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় কতগুলি মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে গেছে। জ্যোতিষ বাস্তুশাস্ত্র পৌরোহিত্য ইত্যাদি আদিম যুগীয় বর্জিত-বিদ্যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন তালিকায় তুলে দিয়ে গেছে। এবারকার দফায় তার তিন বছরের রাজত্বে সে মোদীর দক্ষ পরিচালনায় ইতিমধ্যে আরও বেশ কিছু বড় আকারের পরিবর্তন এনে ফেলেছে। প্রথমে উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী করে বসল এমন একজনকে যিনি বিদ্যালয়ের গণ্ডি কোনক্রমে পার করেছেন। স্মৃতি ইরানী—যার একমাত্র যোগ্যতা হল তিনি সঙ্ঘ পরিবারের একনিষ্ঠ সদস্য। তিনি আবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদে একের পর এক অযোগ্য লোকদের বসিয়ে দিয়েছেন সেই একই মাপকাঠিতে—শুধু মাত্র সঙ্ঘ পরিবারের কাছে আনুগত্যের কারণে ও প্রয়োজনে। পুনা জেএনইউ হায়দ্রাবাদ ইত্যাদি শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে স্রেফ দলীয় হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ জোর করে চাপাতে গিয়ে তারা এই সব জায়গায় আগুন জ্বালিয়েছে। হায়দ্রাবাদের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দলিত মেধাবী গবেষক ছাত্রকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে এরা। পুনার ফিল্ম ইন্সটিটিউতের মাথায় বসিয়েছে একজন তৃতীয় স্তরের সিনেমা কর্মীকে। তার বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ দমন করতে না পেরে পুলিশি সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে তাদের উপর। জেএনইউ-তে কয়েকজন ছাত্রকে ফেক ভিডিও তৈরি করে মিথ্যা দেশদ্রোহের মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়েছে। তাতেও সফল না হওয়ায় সেখানকার একজন ছাত্রকে গায়েব করে দিয়েছে। এবার ভেবে দেখুন, ইসলামি জঙ্গিদের হাতে যতই এ-কে ৪৭ ল্যান্ড মাইন আরডিএক্স ইত্যাদি থাকুক, তাদের পক্ষে ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থায় সিলেবাসে এবং/অথবা প্রশাসনিক কাঠামোয় এরকম একটা ছোট নুড়িও কি যোগবিয়োগের বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষমতা আছে? কাউকে বসানোর কাউকে হঠানোর ক্ষমতা আছে? একটা আঁচড়ও কি কাটার কোনো ক্ষমতা আছে? ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞান বা গণিত শিক্ষার পাঠক্রমে? গত ৭০ বছরে তারা কিছু করতে পারেনি; বিজেপি যা করে চলেছে, আগামী একশ বছরেও এরকম বড় মাত্রার ক্ষতি করার মতো জায়গায় তারা যেতে পারবে বলে মনে হয় না।
ফলে, এই বড় বিপদের বিরুদ্ধেই আমাদের সরব হতে হচ্ছে। যারা দেশের, দেশের শিক্ষা সংস্কৃতির অনেক বেশি—বলা ভালো আসল এবং কার্যকর—ভয়ঙ্কর ক্ষতি করে চলেছে এবং আরও ভয়ানক সর্বনাশ করতে চলেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আমাদের সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের সংজ্ঞা ও আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারেও দু-চার কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। মানসিক উপাদান হিসাবে দুটো কাছাকাছি হলেও ঠিক এক জিনিস নয়, কিন্তু গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং তাদের মধ্যে একটা গসাগু উপাদান হিসাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবীরূপে বিদ্যমান। আবার, ধর্মের সাথে এদের কিংবা এদের মধ্যে পারস্পরিকভাবে যে সম্পর্ক তাকে কোনোভাবেই ঠিক কারণ-কার্য সম্বন্ধরূপে অবধারণ করা সঠিক বিচার হবে না। অর্থাৎ, ধর্ম থাকলেই তার থেকে অনিবার্যভাবে সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদ আসবে, কিংবা কেউ সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা নিয়ে চলে মানেই সে মৌলবাদী, এমনটা সব সময় নাও হতে পারে। যদিও মৌলবাদী মানেই তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা পুরোদস্তুর বর্তমান। এই সব বহু-বর্ণ সম্পর্কগুলি সমাজ-মনস্তত্ত্ব হিসাবেও যেমন সত্য, আবার ব্যক্তিমানসের বিচারেও এই সব কথা মনে রাখতে হয়। তা না হলে বিচারে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

যেমন, মধ্য যুগের ভারতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ ছিলেন, পাশাপাশি বাস করেছেন, নিজের নিজের আচার বিশ্বাস পালন করে গেছেন। তাদের মধ্যে অনেক সময়ই ঝগড়াঝাঁটি মারপিট খুনোখুনি হয়েছে, কিন্তু তা কখনই সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত হয়নি। মেরুকরণ হয়ে যায়নি। অথবা, ঝগড়াঝাঁটির ছবিটাই সাধারণ সার্বক্ষণিক চলমান ছবি ছিল না। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঘটনাই ছিল প্রধান ও প্রলম্বিত বৈশিষ্ট্য (পরে আমরা এই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসব)। আবার, পরাধীন ভারতে মুসলিম লিগ একটি সাম্প্রদায়িক দল হিসাবে আবির্ভূত হলেও সেটা মৌলবাদী ছিল না। হলে আর জামায়াতে-ইসলাম জাতীয় মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের দরকার হত না। পক্ষান্তরে, আরএসএস প্রথম থেকেই অনেক বেশি মৌলবাদী, এবং সেই কারণেই বা তার অন্যতম আধারের সন্ধানেই সে সাম্প্রদায়িক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button