BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের সামনে জন্ম লগ্নেই একটা সুযোগ এসে পড়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের পার্থক্য তুলে ধরার

ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধী সত্যিই এক বিস্ময়কর চরিত্র। ব্যক্তিগত সততা ও আদর্শবাদিতায় তিনি তখনকার অনেক কংগ্রেসি জাতীয় নেতারই সমকক্ষ। বিরাট কোনো ব্যতিক্রম নন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় ওকালতির ব্যবসায়ে অর্থোপার্জন করতে গিয়ে তিনি যে বাস্তব সাংসারিক অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, তাকে তিনি যেভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন রাজনীতিতে, সেখানটায় তিনি অনেকেরই উপরে। বিয়াল্লিশ বছর বয়সে এসে বিলিতি পোশাক তথা কোট প্যান্ট টাই ছেড়ে দিয়ে সেই যে তিনি জৈন শ্বেতাম্বর সন্ন্যাসীর বেশভূষা ধারণ করলেন, বাকি সাঁইত্রিশ বছরে তাকে আর পরিত্যাগ করেননি। এর জোরে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি দ্রুত মহাত্মা হয়ে গেলেন (উত্তর ও মধ্য ভারতে মহাত্মা বলতে লোকে যে কোনো সংসার ত্যাগী কৌপীন পরিহিত সাধু-সন্ন্যাসীকেই বোঝে; রবীন্দ্রনাথের কল্পিত অর্থে নয়)। এই দেশের জনমানসে তাঁকে আর কেউ কখনই টেক্কা দিতে পারেননি রাজনীতির সর্বোচ্চ আসনটি দখলে রাখায়।

কীভাবে?

তিনি সত্যাগ্রহ গণ আইন অমান্য ধর্না অনশন ইত্যাদি যে সব কর্মসূচি কংগ্রেসের সামনে রেখেছিলেন, তাতে স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের আপামর জনসাধারণের যোগদান করা সম্ভব হয়ে গেল। সেই থেকে সেই কর্মসূচি আজ অবধি বামপন্থী মার্ক্সবাদী দলগুলোও অবিকল ব্যবহার করে চলেছে। তিনি যে খদ্দর পরা এবং চরকায় সুতো কাটার কর্মসূচি হাজির করলেন, তাতে যে কোনো মানুষের, এমনকি ঘরের পর্দানশিন গৃহবধূদেরও, দেশের জন্য প্রতিদিন (রূপক তাৎপর্যে) কিছু না কিছু করার এক মহৎ অনুভূতি লাভ করার অবকাশ মিলে গেল। গৃহত্যাগী স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে তিনি যে আশ্রম প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন, সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা দেশের কোনে কোনে নিবু নিবু প্রদীপের মতো হলেও জেগে রয়েছে এবং তাঁর মত ও পথের রেশটাকে ধরে রেখেছে। এখানে তিনি আজও অনন্য। তাঁর এই সব ক্ষেত্রে ভূমিকা আজও পূর্ণাঙ্গ ও সশ্রদ্ধ মূল্যায়নের দাবি রাখে।

কিন্তু এই রচনায় গান্ধীজির উপরে বিস্তৃত চর্চার সুযোগ আমার নেই। আলোচ্য প্রসঙ্গে যতটুকু না বললেই নয়, সেই কটা কথাই আমি বলে নিতে চাই। যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সংস্কৃতির বিকাশের পেছনে তাঁরও যে অনিচ্ছাকৃত হলেও বড় মাপের অবদান আছে, যা এযাবত আমরা মার্ক্সবাদীরা প্রায় দেখেও না দেখার ভাণ করে উহ্য রেখে পাশ কাটিয়ে এসেছি, আপাতত সেই দিকটাই আমি আলোচনা করতে চাই।

যখন থেকে তিনি ভারতের রাজনীতিতে যোগ দিলেন (১৯১১), সেই দিন থেকে বরাবর, কংগ্রেসের তিনি নিয়মমাফিক কেউ নন, চার আনার সদস্যও নন; অথচ তিনিই সব, সব কিছু। তিনি সকলকে নিয়ম মানতে বাধ্য করতে পারেন; কিন্তু তাঁকে কেউ প্রশ্ন করতে সাহস পায় না, তিনি কেন সমস্ত নিয়মের ঊর্ধ্বে। কংগ্রেসের যে কোনো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সিদ্ধান্ত তিনি শুধু আত্মশুদ্ধির উপবাসে বসে এবং সম্পূর্ণ মৌন থেকে দুদিকে স্রেফ আলতোভাবে ঘাড় নেড়ে বাতিল করে দিতে পারেন। দেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির পায়ের তলায় লুটিয়ে দেওয়া, বিশ্বাস, শুধুই অযৌক্তিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁর কাছে সকলের হাত জোড় করে নতশির হয়ে থাকা, সকলের কাজের বা আচরণের মূল্যায়ন হলেও তাঁকে সমস্ত মূল্যায়নের বাইরে রেখে চলা—ভারতীয় রাজনীতিতে এই এক সর্বনাশের ঘন্টা সেদিনই প্রথম বেজেছিল। সামন্তবাদী সংস্কৃতিতে আকণ্ঠনিমগ্ন ভারতীয় বুর্জোয়াদের কাছে কোনো নেতা নয়, দরকার ছিল একজন দৈবাচার্য। গান্ধীর মধ্যে তারা সেই সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে তাঁকেই নিজেদের মসিহা বানিয়ে ফেলে।

রাজনীতিতে তাঁর উপস্থাপনা, তাঁর চলাফেরা—সব এইভাবেই নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পঞ্জাবে ভগৎ সিং—এই রকম দু একজন মানুষ ছাড়া গান্ধীর এই অন্ধ গুরুবাদী চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারিতা ও তাঁর ভক্তদের সীমাহীন স্তাবকতার বিরুদ্ধে কেউ সেদিন মুখ খোলেননি, বা বলা ভালো, কিছু বলার সাহস পাননি। রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘদিন গান্ধীর উচ্চতম প্রশংসা করে এসে একেবারে শেষ বেলায় যখন রাজনীতির মঞ্চে তাঁর কিছু কিছু বিসদৃশ ও অনৈতিক আচরণ দেখে দুঃখ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ব্যক্তি গান্ধী এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত—দুইয়েরই ততদিনে অপূরণীয় ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। আর গান্ধী নিজে এই ক্ষতির পরিণাম বুঝেছেন জীবনের একেবারে অন্তিম লগ্নে, সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিচারের কালে। যখন তাঁর পাশে হাত জোড় করে আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। সেই সময় বক্ষ-বিদীর্ণ হাহাকার নিয়ে তিনি পুরোপুরি একা, নিঃসঙ্গ।

আর তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে বঙ্কিমের চেয়েও সোচ্চারে রাম সীতা তুলসীদাস গীতা রামধুন এই সব নিয়ে এলেন। “রঘুপতি রাঘব . . .” তাঁর প্রিয় গান। গীতায়—যেখানে বিপ্লবীরা পেয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রেরণা, সেই গ্রন্থেই তিনি পেতে লাগলেন নিরস্ত্র অহিংস প্রতিবাদের শুলুক সন্ধান। জমিদারি নিয়ে একই বংশের দুই জ্ঞাতিগোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির রক্তক্ষয়ী লড়াইতে তিনি খুঁজে পেলেন ধর্ম-অধর্ম ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে এক রূপক দ্বন্দ্ব এবং আকাঙ্ক্ষিত নৈতিক বল। এইভাবে গীতা বা অন্য কিছুর যে কোনো রকম ভুল বা অপব্যাখ্যার খোলা জমি তিনি চাষ করে ফেললেন। তিনি এমন এক অহিংসার নীতি নিয়ে প্রচারে মেতে উঠলেন, যা শুধু মাত্র ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষিতেই প্রযোজ্য; অন্যত্র নয়। ইংরেজ যদি আফ্রিকায় স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, চিনের সাথে হিংস্র যুদ্ধে নামে, তিনি তখন তাঁর অহিংসার পরাকাষ্ঠা নিয়ে সেই সব যুদ্ধে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থ দিয়ে লোকবল দিয়ে অস্ত্রধারণে রক্তক্ষয়ী গণহত্যায় সাহায্য করতে পারেন। এর মধ্যে যে তাঁর স্বপোষিত অহিংসা নীতির বিপুল বিরোধ আছে তা তাঁর (এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও) বহু কাল চোখে পড়ে না। আর এইভাবেই এক ভ্রান্ত, ফাঁপা, শাঁসহীন ধ্যান ধারণা নীতির প্রচার আমাদের দেশের জনমানসে সহজেই বাসা এবং দিশা খুঁজে পায়। তার জন্য যুক্তি তথ্য বাস্তবতা—কিছুরই দরকার পড়ে না।

এই সমস্ত তথ্যগুলো সামনে ফেলে রেখে এক এক করে মিলিয়ে দেখুন, ১৯২৫ সালে আরএসএস-এর অঙ্কুরোদ্গমের জন্য আর কী বাকি ছিল। চিন্তা বিশ্বাস ধ্যান ধারণা আচার আচরণের দিক থেকে কিছুই আর প্রায় পড়ে ছিল না। শুধু গান্ধীর ক্ষেত্রে যা ছিল খণ্ড খণ্ড উপচার, আরএসএস সেইগুলিকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলে এক সামূহিক বিচার হিসাবে তুলে ধরেছিল। আর সেই বিচার দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে গ্রাহ্য করে তোলার জন্য উর্বর জমি ততদিনে তৈরি হয়েই গিয়েছিল।

অথচ গান্ধী ব্যক্তিগত জীবনে সাম্প্রদায়িক নন। গান্ধীর চিন্তাধারা এমনকি মৌলবাদীও নয়। আরএসএস নাথুরাম গড়সের হাত দিয়ে এটা অন্তত প্রমাণ করে দিয়েছিল। তাঁর ডাকে ব্যাপকতর সংখ্যায় মুসলিম জনসাধারণ সাড়া না দিলেও মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক মানুষ কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অসাম্প্রদায়িক হওয়ার ভ্রান্ত প্রয়াসেও একটা বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি তখন বুঝেছেন, রঘুপতির নামে আহ্বান জানিয়ে সাধারণ মুসলমানদের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি টেনে আনতে পারবেন না। তাহলে কি শ্লোগান পাল্টে ফেলবেন তিনি? না। উলটে বৃহত্তর মুসলিম জনসমাজকে আকৃষ্ট করার প্রয়োজনে তিনি অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করলেন খিলাফত প্রতিষ্ঠার মতো একটা চরম প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনকে। যার লক্ষ্য সেদিন তুরস্কে সদ্য উচ্ছেদ হওয়া মধ্যযুগীয় ইসলামি খলিফাতন্ত্র আবার ফিরিয়ে আনা। এর পরিণাম কী হল? গণ আন্দোলনের পরিধি যতটুকু বাড়ল, তা দুই প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল চিন্তাধারার মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। তাঁর হাত ধরেই এইভাবে সেদিন মুসলিম জনগণকেও ধর্মান্ধতার দিকেই ঠেলে দেওয়া হল। আর ধর্মান্ধতা বৃদ্ধি যে ফাটল বাড়াতেই সাহায্য করবে, এ আর বেশি কথা কী? আবার এই সব প্রয়াসের দ্বারা তিনি এক ধাক্কায় সীমান্ত গান্ধী, কাজী নজরুল ইসলাম, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, কাজী আবদুল ওদুদ, প্রমুখ চিন্তার দিক থেকে প্রাগ্রসর মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের প্রগতির হাতও দুর্বল করে দিলেন।

এরই পরিণামে আমরা একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলাম: যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের এত শক্তি ছিল না, এত বড় বড় প্রভাবশালী নেতা দেশের বুকে উপস্থিত ছিল না, সেই সময় ১৯০৫-১১ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন কিন্তু সফল হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসক কার্জনের ষড়যন্ত্র প্রায় ব্যর্থ হয়েছিল। আর, স্বাধীনতা আন্দোলন যত এগিয়েছে, যত তার শক্তি বৃদ্ধি হয়েছে, যত গান্ধী নেহরু পটেল পন্থ প্রমুখ নেতাদের ব্যক্তিগত প্রভাব জনমনে বেড়েছে, ততই তার মধ্যে ফাটল ধরেছে, সেই ফাটল বড় হয়েছে, এবং অবশেষে ১৯৪৭-এর অর্ধবর্ষ শেষে দেশকে দুই (আসলে তিন) টুকরো করে স্বাধীনতা পেতে হয়েছে। অর্থাৎ, গান্ধী নেতৃত্বের যেটা শক্তি বলে এতকাল ভাবা হয়েছে, প্রচার হচ্ছে, তা আসলে জাতীয় জীবনের এক মরীচিকা। দুর্বলতারই ছদ্মরূপ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এই নির্মল সুতীক্ষ্ণ রসিকতাটিকে অনেকেই বোধ হয় আজ পর্যন্তও লক্ষ করে উঠতে পারেননি।
আর, না বুঝে বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে, এই যে দুষ্ট উদাহরণটি গান্ধী একবার খাড়া করে গেলেন, হাজারও ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও এটাই ভারতীয় জাতি-রাজনীতি এবং জাতীয় রাষ্ট্রের চিরস্থায়ী অঙ্গভূষণ হয়ে রইল। অসাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার একমাত্র অর্থ দাঁড়িয়ে গেল, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিকৃষ্ট রক্ষণশীল উপাদানগুলির মধ্যে উদার ভ্রাতৃত্ব। কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে নেহরুর পছন্দের তালিকায় শেখ আবদুল্লাহ নয়, উঠে এল বক্সি গোলাম মহম্মদ। রাজীব গান্ধীর মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পেল শাহবানু মামলার বিচারালয় প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রক্ষণশীলদের চাপে মুসলিম পার্সোনাল ল-কে আরও নারী বিরোধী করে তোলার মধ্যে।

আর আপাতত সর্বশেষ যে ঘটনাটির উল্লেখ করতে চাই, সেইটি এর মধ্যে সবচেয়ে খাসা। রাজীব গান্ধীর কংগ্রেসকে পরাস্ত করে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এর নেতৃত্বে যে জনতা সরকার গঠিত হল, তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী করা হবে একজন মুসলিম ব্যক্তিকে—এই মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরামর্শ নিতে তাঁরা চললেন—কোথায় জানেন? দিল্লির জামা মসজিদের ইমাম বুখারির কাছে। তাঁদের হাতে ছিলেন দুজন ক্যান্ডিডেট—আরিফ মহম্মদ খান এবং মুফতি মহম্মদ সঈদ। বুখারি তাঁদের বললেন, আরিফ কস্মিনকালে নয়। ও কোনো মুসলমানই নয়। ও শাহবানু মামলায় আদালতের রায়ের পক্ষে ছিল, রাজীব গান্ধীর মুসলিম নারীর অধিকার (রক্ষা) বিলের ও বিরোধিতা করেছিল। শরিয়তের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। ওকে মন্ত্রীসভায় নেওয়া যাবে না। মুফতি? হ্যাঁ, ওকে করা যাবে। ও পাঁচবার নামাজ পড়ে, খাঁটি ঈমানদার লোক, সাচ্চা মুসলিম। তা, সেবার সেই মুফতি মহম্মদ সঈদকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রিত্ব দেওয়া হল। গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত সেই ঐতিহ্য সমানে চলেছে।

একটা ছোট পাদটীকা দিয়ে রাখা ভালো: সেই ঈমানদারের কন্যা মাহবুবার নেতৃত্বাধীন দলের সাথেই এখন কাশ্মীরে বিজেপি-র সুদৃঢ় আঁতাত। নিশ্চয়ই তারও কিছু গূঢ় কারণ আছে! আরও আশ্চর্যের কথা হল, যে শরিয়তি আইন নিয়ে বিজেপি-র ব্যাপক বিক্ষোভ আছে, মাহবুবার দল কিন্তু সেই শরিয়তের একনিষ্ঠ সমর্থক। অর্থাৎ, খাঁটি মৌলবাদী হতে পারলে, ধর্ম নির্বিশেষে হাতে হাত দিব্যি মিলে যায়!

তাই বলছিলাম, এই সমস্ত আপসই শেষ পর্যন্ত সঙ্ঘ পরিবারের হাত শক্ত করেছে। তার সাংগঠনিক শক্তি কম বা বেশি যেমনই হোক না কেন, তার আদর্শগত জমি এই রাষ্ট্র এবং তার রাষ্ট্রনায়কদের হাতেই ক্রমাগত পাকাপোক্ত হয়ে চলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের অজান্তে; কখনও কখনও হয়ত জেনে-বুঝেই। জনসাধারণের মধ্যেও তাদের প্রচার ক্রমাগত ছাপ ফেলে চলেছে। এর ফল হয়েছে দুটো: যখন তখন দেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানি লাগিয়ে দেবার মতো পরিস্থিতি প্রস্তুত হয়েই থাকে; যাকে বলা যেতে পারে সক্রিয় সাম্প্রদায়িকতা (active বা hard communalism)। আর, যখন দাঙ্গা হাঙ্গামা হচ্ছে না, তখনও তার সপক্ষে একটা মতবাদিক আদান-প্রদান “ওরা-আমরা” সমস্ত দেশ জুড়েই চলতে থাকে; একে আমি বলতে চাই নিষ্ক্রিয় সাম্প্রদায়িকতা (passive বা soft communalism)। এই প্রায়-অদৃশ্য সার্বক্ষণিক নিষ্ক্রিয় সাম্প্রদায়িকতাই আমার মতে বেশি বিপজ্জনক। আসল বিপদ।

[৬] ভারতীয় সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা: আরও কিছু ভ্রম নিরসন

স্বাধীন ভারত কি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল? অনেকেই মনে করেন—তার মধ্যে বহু বামপন্থী এবং মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবীও পড়েন—হ্যাঁ, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট শেষে স্বাধীনতার সেই রক্তমাখা ধূসর রাত্রিতে পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করেছিল এক ইসলামিক রাষ্ট্র রূপে, কিন্তু স্বাধীন ভারতের জন্ম হয়েছিল নাকি এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবেই। তাঁরা এর জন্য পণ্ডিত নেহরু প্রমুখ কংগ্রেসের একটা বড় অংশকে বেশ প্রগতিশীল বলেও মনে করেন। যার অর্থ হল, এই ব্যাপারেও প্রকৃত ইতিহাস কী বলে তাঁরা তার কোনো খোঁজখবর রাখেন বলে মনে হয় না। অথবা, জানলেও চেপে যান।

এই ব্যাপারে প্রথম হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেন ভারতের প্রথম এবং সুদীর্ঘ সময়ের (১৯৫০-৬৩) অ্যাটর্নি জেনারেল, ভারতের প্রথম ল কমিশনের চেয়ারম্যান (১৯৫৫-৫৮), পদ্মবিভূষণ, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, মোতিলাল চিমনলাল শেতলবাদ। আকাশবাণী দিল্লি কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর ১৯৬৫ সালের এক বেতার বক্তৃতায় তিনি বলেন, “প্রকৃত অর্থে ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা বোধ হয় ভুল হবে।” [Setalvad 1967, 20] তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে সংবিধান রচনা পরিষদে দু-দুবার এই শব্দটি ঢোকানোর প্রস্তাব উঠেছিল, দু-বারই তা সংখ্যাধিক্য ভোটে বাতিল হয়ে যায়। [Ibid, 21] আসলে এই শব্দটি সংবিধানের ভূমিকায় জায়গা পায় ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়, যখন ইন্দিরা গান্ধী তাঁর স্বৈরাচারী রাজকে সমাজতান্ত্রিক কথামালায় সাজিয়ে তুলছিলেন নানাভাবে। বোঝাই যায়, দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ তৈরি করার চাইতেও তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল নিজের এক প্রগতিশীল ভাবমূর্তি নির্মাণের দিকে। কেন না, সংবিধানে শব্দটির প্রবেশের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পঞ্জাবে উগ্রপন্থী শিখ সন্ত্রাসী ভিন্দ্রানওয়ালাকে ধীরে ধীরে পেছন থেকে মদত দিয়ে অকালি দলকে ভাঙার আয়োজন করতে থাকেন। অন্য দিকে সেই সন্ত্রাসকে দেখিয়ে দেশের অন্যত্র তিনি প্রচ্ছন্নভাবে নিজের জন্য এক হিন্দুপ্রীতির ছবি আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সারা দেশের বুকে সংসদীয় রাজনীতিকে এইভাবে খুল্লমখুল্লা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ভরিয়ে তোলা সম্ভব হয় এই শব্দটির গম্ভীর সাংবিধানিক অস্তিত্বের মধ্যেই।

প্রয়োগের দিক থেকে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের সামনে জন্ম লগ্নেই একটা সুযোগ এসে পড়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের পার্থক্য তুলে ধরার। নতুন সংবিধান চালু হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি। তার ঠিক এক মাস আগে, ১৯৪৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদল সাম্প্রদায়িক জঙ্গি হিন্দু কুচক্রী চারপাশে পুলিশ প্রহরা থাকা সত্ত্বেও শেষ রাতে বাবরি মসজিদের মধ্যে রাম-সীতা-লক্ষ্মণের মূর্তি ঢুকিয়ে রেখে আসে। পরদিন সকালে তারাই প্রচার শুরু করে দেয়, রামচন্দ্র নিজেই “জন্মস্থান” দখল নিতে চলে এসেছে। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই পটেল। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন গোবিন্দবল্লভ পন্থ। তাঁর আর এক সহমন্ত্রী ছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। এই সব বাঘা বাঘা নেতারা মসজিদ দখল ও অপবিত্র করার বিরুদ্ধে সেদিন অনেক গরম গরম কথা বলেছিলেন। আর আরএসএস তখন গান্ধী হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত। কিন্তু ফৈজাবাদ জেলার জেলাশাসক ও রাজ্যের বিচারবিভাগ হিন্দু মৌলবাদীদের পক্ষ নিয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ করে দেয় এবং হিন্দুদের পেছন দরজা দিয়ে ঢুকে রাম পূজার অনুমতি দিয়ে দেয়। কংগ্রেসের সমস্ত নেতাই তখন হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। লক্ষ করে দেখলেই বোঝা যাবে, নব স্বাধীন পাকিস্তানের সঙ্গে সদ্য স্বাধীন ভারতের পার্থক্য রইল শুধু এই জায়গায় যে ওরা যে কাজগুলো অত্যন্ত হৈ-হুল্লোর করে করতে পারে এবং করেও থাকে, ভারতে ঠিক সেই কাজগুলোই করা হয় কিঞ্চিৎ আড়াল আবডাল রক্ষা করে। যদিও, আজ সেই আড়ালটাও আর মৌলবাদীরা রাখতে চাইছে না বা পারছে না।

আরও উদাহরণ আছে।

স্কুলে ভর্তি হতে গেলে একটা সরকারি কাগজে আমাদের ধর্ম জাত ইত্যাদি লিখতে হয় (আজকাল অবশ্য এটা আর আবশ্যক থাকছে না)। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েও তাই। আপনি ইতিহাস বিজ্ঞান সাহিত্য পড়বেন, তার সাথে আপনার কী জাত কী ধর্ম, তার সম্পর্ক কী? ইংরেজদের দেখানো পথেই এই স্বাধীন দেশে বেনারসে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আর আলিগড়ে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় টিকে রইল। এবং সেই দুটোই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। দিল্লির কায়দায় পশ্চিম বঙ্গে বামফ্রন্টের আমলেও মুসলিমদের জন্য আলাদাভাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে মুসলিম প্রীতির নমুনা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। কলকাতার বুকে আজ অবধি হিন্দু হোস্টেলে মুসলিম ছাত্র বা বেকার হোস্টেলে হিন্দু ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করা গেল না। ইংরেজদের রেখে যাওয়া সেই উত্তরাধিকার আমরা আজও আমাদের সেক্যুলার কাঁধে দিব্যি বহন করে চলেছি। এমন নয় যে কোথাও এই ঐতিহ্য আমরা ভাঙতে পারিনি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রহোস্টেলগুলিতে এটা সম্ভব হয়েছে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলিতে এটা সম্ভব হল, বিশ্বভারতীতেও এটা করা সম্ভব হয়েছে। শুধু এখানে, ভারতীয় রেনেশাঁসের ভেনিস খোদ কলকাতার বুকে কেন এটা সম্ভব হল না—কেউ কি কেউ কখনও ভেবে দেখেছেন? সত্যিকারের অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলে কোনো দেশে এইসব জিনিস সম্ভব হয়?

দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি সংখ্যালঘু অধিকারের নামে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এটার দ্বারা আসলে সংখ্যালঘুদের কিছু বাড়তি অধিকার দেবার নামে তাদের ধর্মীয় পশ্চাদপদতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে মুসলমান জনসাধারণকে চিরকালের জন্য জাতীয় মূলস্রোত থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে, প্রান্তবাসী করে দেওয়া হয়েছে। অথচ, যদি দেখা যায়, ইসলামি শরিয়তে সত্যিই এমন কিছু বিধিবিধান আছে যা আধুনিক সমাজ নির্মাণেও কাজে লাগতে পারে (থাকতেই পারে, আমার এটা ভালো করে জানা নেই), তাহলে তা সাধারণভাবে সকলের জন্য গ্রহণ করলেও তো ভালো হত। ভারতের সংবিধান রচয়িতারা ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়ার সংবিধান বা সাংবিধানিক প্রকরণ থেকে অনেক কিছু যেমন নিয়েছেন, তেমনই ভালো বুঝলে ইসলামি শাসনপদ্ধতির প্রকরণ থেকেও কিছু জিনিস নিতে পারতেন। তাতে অন্তত সেক্যুলারপন্থীদের তো আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং দেশের সামনে শুভবুদ্ধি ও যুক্তিপরায়ণতার একটা সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেত। আসলে ভালোমন্দ বিচার তো নয়, মুসলমানকে মুসলমান করে রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিসাবেই এগুলো যে করা হয়েছে তা আর কতজন এপর্যন্ত ভেবে দেখেছেন?

এর ফলে যে হিন্দু বা অপরাপর নারীদের সাথে মুসলিম নারীদের অধিকারের তারতম্য ঘটে গেল তা তাঁরা খেয়াল করেননি। মুসলিম আইনে পুরুষের বহুবিবাহ এর ফলে সংবিধান অনুমোদিত ও আইনসিদ্ধ হয়ে যাওয়াতে হিন্দু ও মুসলিম নারীর অধিকারের মধ্যে বিপুল অসাম্য এসে গেল, সংবিধানের অন্যত্র প্রদত্ত নারী-পুরুষ মৌলিক সমানাধিকারের ধারার সাথে মুসলিমদের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর অধিকারের বৈষম্যের বিরোধ হয়ে গেল—এগুলোও তাঁরা ধরতে পারেননি। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও মুসলিম নারীদের অধিকার হিন্দু বা অপরাপর সম্প্রদায়ের নারীদের তুলনায় সঙ্কুচিত হয়ে পড়ল; আবার মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের প্রশ্ন আরও একটা জায়গায় (বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে) ধাক্কা খেল। ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সমস্ত ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে বয়ে বেড়াবার যে ভ্রান্ত সাংবিধানিক নীতি সেদিন গৃহীত হয়েছিল, তারই জের হচ্ছে এই সমস্ত বিচিত্র বিধান। ইন্দিরা গান্ধী যখন সংবিধানের ভূমিকায় এই শব্দটি জুড়ে দিলেন, তখন তাঁরও মনে হয়নি যে সংবিধানের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী এই সব বিষম বিধানগুলিকে নিয়েও তাঁর কিছু করার আছে। আসলে শব্দই তো ব্রহ্ম। বাকি সবই মায়া। অত ভেবে কাজ কী?

এই দুর্বলতা আমাদের রাজনৈতিক জীবনকে চারদিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। নির্বাচনের প্রার্থীরা সাধু বাবা-মায়েদের পদসেবা করেন, চরণামৃত পান করেন, গণ মাধ্যমে তার ব্যাপক প্রচার হয়। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রচুর ঢাকঢোল পিটিয়ে তিরুপতি মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসেন, মাথা ন্যাড়া করে বহুমূল্য চুল দান করে ফেলেন, গণমাধ্যমে তার তড়িৎ-খবর হয়। বড় বড় নেতারা দুই হাতের আট আঙুল ভর্তি করে রঙ-বেরঙের আংটিপাথর পরে ঘুরে বেড়ান। এমএলএ এমপি প্রার্থী পদের ফর্ম জমা দেওয়া, জিতলে শপথ গ্রহণ—সবই তাঁরা করেন নিজেদের আস্থাভাজন বিশিষ্ট জ্যোতিষীর পরামর্শমতো পাঁজিপুঁথি শুভাশুভক্ষণ দেখে। তারও তুমুল প্রচার হয়। কী করে এগুলো একটা আধুনিক সমাজে সম্ভব হয়?
একই দেশের অনেকগুলো রাজ্যে (যেমন, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, ইত্যাদি) ধর্মের নামে গোবধ আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ। এইভাবে দেশেরই এক বিরাট সম্প্রদায়ের মানুষদের তাদের স্বাভাবিক খাদ্য উৎস থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখানে যে সংখ্যালঘুর খাদ্যাভ্যাস (জীবন-ধারণ)-এর মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত সাংবিধানিক ধারাগুলি লঙ্ঘিত হল, তা আর কেউ খেয়াল করছে না। হয়ত এরই জবাবি নিদান হিসাবে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক শুক্রবার বেলা বারটা থেকে দুটো পর্যন্ত শুধু যে ক্যান্টিনগুলি বন্ধ থাকে তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত জলের লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে ক্যাম্পাসের ভেতরে কোথাও কোনো চায়ের দোকানও ওই দু ঘন্টা চলতে না পারে। এই সবও যে বিপরীতভাবে অমুসলিম (বা এমনকি ধর্মে অবিশ্বাসী মুসলিম) পরিবারের ছাত্রছাত্রী কর্মচারি এবং শিক্ষকদের (এবং সেই সময় কোনো কাজে ক্যাম্পাসে আসা অভিভাবক-অতিথিদের) সংবিধান-প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ভঙ্গ করার সামিল, তাও আর কেউ ভেবে দেখছে না। এই সব তথ্যের নিরিখে মাঝে মাঝেই আমার খুব সন্দেহ হয়, আমরা ভারতবাসীরা আজও কোন যুগে পড়ে আছি। নিজেদের চার বছর ধরে অনেক ভাষণবাজি তক্কাতক্কি করে বানানো একটা ইয়াব্বড় দলিলের এক অধ্যায়ের নির্দেশাবলির সাথে আর এক অধ্যায়ের হুকুমনামার নিজেরাই খটামটি লাগিয়ে দিই। এবং সেটা কখনও বুঝে উঠতেই পারি না। ধারার পরা বদলায়, সংশোধন হয়, কিন্তু সেই খটাখটির জায়গাগুলো বহাল তবিয়তে থেকে যায়!

আর আমি আবার বলছি—এই সমস্ত পশ্চাদপদ রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল বিধানগুলির কোনোটাই সঙ্ঘ পরিবারের তত্ত্বাবধানে বা তাদের হাতে সম্পন্ন হয়নি। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলির নেতৃত্বে অধীনে ও উদ্যোগেই এই সব ভ্রান্ত ও অন্যায় পদক্ষেপ বহু দশক ধরে ধাপে ধাপে নিষ্পন্ন হয়ে চলেছে। আরএসএস কোম্পানি শুধু এর থেকে যথাযোগ্য ফায়দা নিতে পেরেছে এবং নিয়ে যাচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button