BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

হিন্দু মৌলবাদের জন্ম ও পুষ্টি

ধর্মীয় বিশ্বাস আচার ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে একটা গোষ্ঠী যখন নিজেদের একটা বৃহত্তর (কাল্পনিক) ধর্মীয় স্বার্থবোধের দ্বারা তাড়িত ও চালিত হয়, সমাজ ও জীবনের অন্য সমস্ত স্বার্থবোধকে তার কাছে বিলুপ্ত বা গৌণ করে ফেলে, এবং এক (বা একাধিক) ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তার সেই স্বার্থ চরিতার্থতার পথে বাধা বা প্রতিবন্ধক বলে ভাবতে থাকে, তখন সেই গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে পড়ে। একাধিক ধর্মসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এবং চিহ্নিতকরণ সাম্প্রদায়িকতার এক অন্যতম প্রধান শর্ত। সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তার প্রধান লক্ষণ এবং অবলম্বন। এই শত্রুতা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটে কখনও কখনও দাঙ্গার মাধ্যমে, অস্ত্রের ঝনঝনানিতে, নৃশংস রক্তপাতে।

কিন্তু, মৌলবাদ তো শুধু এইটুকু নয়। সে প্রথমে তার নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেই শত্রু চিহ্নিত করে ফেলে। তারপর এবং তার ভিত্তিতে সে অন্যত্রও শত্রু খোঁজে। কেন না, শত্রু বেশি হলে তার সুবিধা হয়। তার লক্ষ্য তার ধর্মের আদিম যে বিশ্বাস প্রথা প্রকরণ আচার আচরণকে তারই সম্প্রদায়ের মানুষ ইতিহাসের লম্বা সরণিতে জীবনের স্বাভাবিক উজানে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে, সেইগুলিকে আবার ভাঁটিতে ফিরে গিয়ে খুঁজে খুঁজে তুলে আনা, অন্তত আনার কথা বলা, তার ভিত্তিতে আধুনিক জীবনচর্যাকে সর্বপ্রযত্নে বিরোধিতা করা। ফলে তার প্রথম এবং প্রধান শত্রু অন্য কোনো সম্প্রদায় নয়, তারই সম্প্রদায়ের যুক্তিবাদী সমাজপরিবর্তনকামী ইতিহাস-বিশ্বাসী মানুষ। তারপর তার লক্ষ্য তার ধর্মের আদিম বর্জিত উপাদানসমূহকে মানজাতির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক অর্জন হিসাবে দেখানো এবং প্রচার করা। সেই প্রয়োজনে তাকে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়কেও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে তুলতে হয়। এই অর্থে মৌলবাদী শক্তি একটা সমাজের পক্ষে আরও বড় বিপদ ডেকে আনে। তার শুধু সাময়িক ভিত্তিতে এলাকা ধরে ধরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করলে হয় না, এক সার্বক্ষণিক সাঙ্ঘর্ষিক জঙ্গি উত্তেজনাকে জাগিয়ে রাখতে হয় তাকে।

ভারতীয় উপমহাদেশের তিন টুকরোকে বিগত শতাব্দের ইতিহাসের দীর্ঘ মেয়াদে ভালো করে লক্ষ করলে এই সমস্ত উপলব্ধিগুলোকে মিলিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন শক্তিগুলিকে চিনতে পারা হয়ত একটু সহজ হবে।

[৪] হিন্দু মৌলবাদের জন্ম ও পুষ্টি

আমি এবার সরাসরি ভারতের সমস্যার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সঙ্ঘ পরিবারের যে মৌলবাদ তার জন্ম হল কীভাবে? সে তো আকাশ থেকে পড়েনি। এই দেশেরই সংস্কৃতির জল মাটি হাওয়ায় সে শ্বাস গ্রহণ করেছে, পরিপুষ্ট হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ লগ্নে, যখন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্ব দেশের বুকে প্রায় অবিসংবাদী রূপে প্রতিষ্ঠিত, অত্যন্ত জনপ্রিয়, জাতীয় কংগ্রেস যখন খুবই শক্তিশালী জনপ্রিয় সংগঠন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত, সেই সময়ে, উত্তাল জাতীয়তাবাদের লগ্নে, ১৯২৫ সালে, এরকম একটি উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী এবং দেশ ও জাতীয়তা বিরোধী সংগঠনের উৎপত্তি সম্ভব হল কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতে হবে। এর সুষ্ঠু মীমাংসা এখনও হয়নি।

সকলেই জানেন, সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শের মূল উপাদান দুটো। এক, প্রাচীন ভারতের সব কিছুই জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দুই, এই উপাদানগুলো সমস্তই নষ্ট হয়েছে মূলত মুসলমান রাজত্বের কালে। যা কিছু ওরা বলে, যত ফেনিয়েই বলে, যত খারাপভাবেই বলে, তার সবই হচ্ছে এই দুটো মৌল উপচারের ভাব সম্প্রসারণ। এর বাইরে আর অন্য কোনো কথা ওদের সিলেবাসে নেই।

কিন্তু এই উপচারগুলি ওরা কোথায় পেল? সঙ্ঘ পরিবারের তিন আদি গুরু—হেডগেবার, গোলওয়ালকর, সাভারকর—তাঁরাই কি এগুলোর আবিষ্কারক এবং প্রথম প্রবক্তা?

না। আমি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, আরএসএস প্রতিষ্ঠার অন্তত ছয় দশক আগে থেকেই এই চিন্তাগুলি ভারতীয় শিক্ষিত মননে ঘুরপাক খাচ্ছিল। মূলত শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত অগ্রসর বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, প্রমুখর লেখনী ও বাণীতে।
তাঁদের মাথাতেই বা এ জাতীয় চিন্তাভাবনা এল কোত্থেকে?

ইংরেজ শাসনের সূত্র ধরে। দুই বিভিন্ন পথে। এক বিচিত্র গ্রহণ ও বর্জনের প্রক্রিয়ায়। সেই জায়গাটা আমাদের প্রথমে বুঝে নিতে হবে। ভারত ইতিহাসের এ এক নির্মম রসিকতা।

ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজ প্রশাসকদের তরফে ভারতীয় সমাজ জীবন সংস্কৃতি ও সভ্যতা সম্পর্কে যে ঔপনিবেশিক তাচ্ছিল্য ঘৃণা অবজ্ঞার মনোভাব ব্যক্ত হত তার প্রতিক্রিয়ায় উনিশ শতকের একদল উচ্চশিক্ষিত ভারতীয় নিজেদের সম্পর্কে এক কাল্পনিক উচ্চশিখর প্রাচীন সভ্যতার জয়গানে মুখরিত হয়ে ওঠেন। বঙ্কিম চন্দ্রের “মা যা ছিলেন, . . .”, বিবেকানন্দের “হে ভারত ভুলিও না, . . .”, ইত্যাদি এই কল্পস্বর্গেরই উচ্চকিত আলাপন। এর থেকেই শুরু হয় বৈদিক জনজাতির লোকেদের সম্পর্কে এক আর্য-গরিমা কীর্তন। ঋগ-বেদ হয়ে ওঠে সর্বজ্ঞান সংগ্রহ এবং সর্বোচ্চ জ্ঞানের এক দৈব অপৌরুষেয় আকর। গঙ্গা-সিন্ধু অববাহিকার নিবিড় অরণ্য হয়ে ওঠে কোনো এক মনোরম তপোবন (প্রায় এখনকার অভয়ারণ্যের মতো)। সেকালের সমস্ত মানুষের জীবনে ফুটে উঠতে থাকে গণিতের ‘চার’ নামক সংখ্যাটির বিচিত্র রহস্যময় ক্রীড়াশীলতা—চতুর্বেদ, চতুর্বর্ণ, চতুরাশ্রম, চতুর্বর্গ, চতুর্যুগ, চতুর্মুখ, চতুরানন, ইত্যাদি। ধীরে ধীরে প্রাচীন ভারতে আধুনিক গণতন্ত্রের পার্লামেন্ট জাতীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিরও সাক্ষাত মেলে। তারপর ইউরোপ/আমেরিকায় যেমন যেমন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হতে থাকে, সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই সব কিছুই প্রায় খুঁজে পাওয়া যেতে থাকে বেদে, পুরাণে, উপনিষদে, তন্ত্রশাস্ত্রে, সাঙ্খ্য-বেদান্তে। সেই তালাশ আজও শেষ হয়নি।

এই মিথ্যা গর্বের অনুসন্ধান অনিবার্যভাবে একই সঙ্গে এক চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক মানসের জন্ম দেয়। যুক্তি ও তথ্যের বদলে বিশ্বাস এবং সংস্কারকেই জ্ঞান অর্জনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে ফেলে। কী জানা গেল সেটা নয়, কী জানলে সুবিধা হবে—তার ভিত্তিতে জ্ঞানচর্চা করার মন তৈরি করে দেয়। খোঁজার-আগেই-খুঁজে-পাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে গবেষণা।

এই অন্ধতার প্রভাবেই, ব্রিটিশদের প্রচারিত আর একটি মিথ্যাকে তাঁরা বিনা বিচারে সত্য বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যান। সিপাহি বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা শিক্ষা বিষয়ক সমস্যাগুলিকে গতানুগতিকভাবে দেখছিল। কিছুটা লেখাপড়া শিখিয়ে কাজ চালানো গোছের কিছু কেরানি তৈরি করার জন্য তারা এখানে ওখানে দু-দশটা স্কুল খুলছিল, তারপরে একটা-দুটো করে কলেজও খুলেছিল, এইভাবে চলছিল। ১৮৫৭ সালে প্রায় আধা-ভারত জোড়া সিপাহি বিদ্রোহ এবং তার সমর্থনে সীমিত আকারে হলেও এক ধরনের গণ অভ্যুত্থান তাদের আত্মবিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দেয়। তারা বুঝে যায়, শুধু সেপাই বরকন্দাজ দিয়ে ধমক-ধামক দিয়ে হয়ত আর বেশিদিন এই দেশে নির্বিঘ্নে ব্যবসাবাণিজ্য লুটপাট চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে এই সময় থেকেই তাদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে ভারতের জনমানসে একটা স্থায়ী ফাটল ধরিয়ে দেওয়া, যা তাদের জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে দেবে না। বা অন্তত জাতি গঠনের প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও বিলম্বিত করবে। ১৮৮০-র দশকে কয়েকজন ব্রিটিশ ইতিহাস লেখক ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুযুগ, মুসলিম যুগ ও আধুনিক যুগ—এইভাবে ভাগ করে ফেলেন। তারপর তাঁরা হিন্দুযুগকে খুব শান্তিপূর্ণ সংস্কৃতির বিকাশের কাল হিসাবে চিত্রিত করেন। আর মুসলমান যুগকে দেখান হিন্দুদের উপরে নিরবচ্ছিন্ন অত্যাচার নির্যাতনের এক লম্বা সিরিয়াল হিসাবে। তখন ধরে ধরে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, হিন্দুদের দেবদেবীর মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। [Grewal 1970; Hodiwala 1939; মুখোপাধ্যায় ২০০৩] এই কথাগুলিকে এ দেশের তদানীন্তন বুদ্ধিজীবীরা প্রায় বিনা বিচারে বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তাঁদের একবারও মনে হয়নি, এই রকম প্রচারের পেছনে ব্রিটিশ শাসকদের কোনো দুরভিসন্ধিমূলক স্বার্থ থাকতে পারে। তাঁরাও এই কথাগুলিকে তথ্য দিয়ে যাচাই করে দেখার চেষ্টা করেননি। আসলে এই বিচারশীল মনটাই তখন তাঁদের নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button