ইতিহাস-চেতনা ও সাংস্কৃতিক-বোধবুদ্ধির এই রকম ভ্রান্ত উপাদানগুলিই ভারতের এক বিরাট অংশের মানুষের মনে সঙ্ঘ-পরিবারের ধ্যান-ধারণার ভিত্তিভূমি রচনা করতে থাকে।
প্রথম দিকের জাতীয়তাবাদী নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা ভারতের জনমানসে জাতীয় আবেগ দেশপ্রেম ইত্যাদি জাগিয়ে তোলার জন্য ব্রিটিশদের পরিবেশন করা ইতিহাস থেকে যে বীর-মূর্তি (hero-icon)–গুলি বেছে নিলেন তা হল রাণা প্রতাপ, ছত্রপতি শিবাজি, প্রমুখ। রাণা প্রতাপের লড়াই ছিল আকবর-এর সঙ্গে; শিবাজির ছিল অওরেঙজেব-এর সঙ্গে। ফলে জাতীয়তাবাদের আগমন-ধ্বনি রচিতই হল তথাকথিত এক নিরন্তর হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের কলরব দিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠের প্রথম সংস্করণে ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের কথা বললেও শাসকের ধমকে দ্বিতীয় সংস্করণেই বইটিকে আমূল বদলে ফেলে মুসলিম শাসকদের শত্রুস্থানে বসিয়ে দিলেন, ইংরেজদের দেখালেন হিন্দুর রক্ষাকর্তা হিসাবে। দেশ হয়ে গেল দেশমাতা, রূপকে মা দুর্গা। দেশকে ভালবাসার জন্য প্রথম যে সঙ্গীত (“বন্দে মাতরম”!) রচিত হল তা কোনো মুক্তি সংগ্রামের অভিযাত্রিক গীত হল না; তা হয়ে গেল দেশভক্তিগীতি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই শব্দবন্ধের নিষ্পন্ন কর্মধারয় সমাসে মধ্যপদটি কোনোদিনই আর লোপ পেল না। আজও হিন্দি ভাষায় দেশাত্মবোধক গানকে বলা হয় দেশভক্তিগীতি। স্কুল বসার প্রাক্কালে ছাত্রদের জাতীয় সঙ্গীত গাইবার নাম প্রার্থনা—প্রেয়ার। শপথ গহণ নয়। আজ অবধি। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মহারাষ্ট্রের শিবাজি-উৎসব এক বিপুল গরিমা লাভ করে; রমেশ চন্দ্র দত্তের উপন্যাসে, দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকেও রাজস্থানের রাজপুতদের এক মিথ্যা অবিচল দেশপ্রেম-কাহিনি রোমান্টিক কল্পবিলাসে দেশবাসীকে মগ্ন করে দেয়।
ইতিহাস-চেতনা ও সাংস্কৃতিক-বোধবুদ্ধির এই রকম ভ্রান্ত উপাদানগুলিই ভারতের এক বিরাট অংশের মানুষের মনে ধীরে ধীরে সঙ্ঘ-পরিবারের ধ্যান-ধারণার ভিত্তিভূমি রচনা করতে থাকে। তাই আমি মনে করি, ওদের গাল দেবার আগে, সমালোচনা করার আগে আমাদের এই দুর্বল ইতিহাসবোধ, এই মিথ্যা দেশপ্রেম-সন্ধানকে চিনে নিতে হবে।
এরপর চলে আসতে হবে আমাদের রাজনৈতিক বোধভূমিতে।
বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পৃষ্ঠভূমি রচনা করেছিল বললে খুব একটা ভুল বলা হয় না। সেই উপলব্ধি জাতীয় আন্দোলনকে প্রথম থেকেই এক খর্বিত চেতনায় প্লাবিত করে ফেলল। ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম সেই চেতনার আপ্লবে স্বাধীনতার যোদ্ধাদের অচেতনেই হয়ে পড়ল হিন্দুদের অভ্যুত্থান কার্যক্রম। যে সমস্ত ছোট ছোট বিপ্লবী গোষ্ঠী গড়ে উঠল বঙ্কিমী আনন্দমঠের সন্তানদের আদলে, কালী মন্দিরে রক্তশপথ নিয়ে যাদের সংগ্রামে যোগদান শুরু হয়, গীতা হয়ে গেল তাঁদের প্রেরণা-উৎস। বাল গঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিলেন শিবাজি উৎসব আর গণেশ পুজোর মাধ্যমে। এইভাবে সেদিন ভারতীয় রাজনীতি তার প্রাইমারি শিক্ষার স্তর পার করে মাধ্যমিক স্তরে এসে উপনীত হল। তার আষ্ঠেপৃষ্ঠে হিন্দুচেতনা; তার আগাগোড়া হিন্দুধর্মীয় পলেস্তারা। সে চায় এক অখণ্ড ভারতীয় জাতি; তার ভিত্তিতে সে রেখেছে শুধুই হিন্দু ধর্মীয় অনুষঙ্গ।
এর আর এক পরিণতি হল, হিন্দু ধর্মের বাধ্যতামূলক অঙ্গ জাতিভেদ প্রথা এই জাতীয় ঐক্যের দুর্বল প্রয়াসের মধ্যে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই জায়গা পেয়ে গেল। তথাকথিত উচ্চবর্ণের আধিপত্য যতটা বাস্তবে, তার চেয়ে অনেক বেশি আশঙ্কায়, এই আন্দোলনের শক্তিকে গ্রাস করে নিল, একে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেতে লাগল। স্বাধীনতা আন্দোলন শুধু হিন্দু্ধর্মাবলম্বীদের নয়, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রায় সোচ্চার চারণভূমি হয়ে উঠল। স্বয়ং তিলকের নেতৃত্বে এবং নির্দেশেই একটা সময় থেকে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে রাজনৈতিক সম্মেলনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কার সম্মেলন মঞ্চটি বন্ধ করে দেওয়া হল। তখনও কিন্তু আরএসএস নামক উপদ্রব এসে পৌঁছয়নি ভারতের রাজনীতির সক্রিয় রঙ্গমঞ্চে।
তার কিছুদিন পরই রাজনীতির ময়দানে আবির্ভাব ঘটল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর।
[৫] অবশেষে গান্ধীও . . .!
ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধী সত্যিই এক বিস্ময়কর চরিত্র। ব্যক্তিগত সততা ও আদর্শবাদিতায় তিনি তখনকার অনেক কংগ্রেসি জাতীয় নেতারই সমকক্ষ। বিরাট কোনো ব্যতিক্রম নন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় ওকালতির ব্যবসায়ে অর্থোপার্জন করতে গিয়ে তিনি যে বাস্তব সাংসারিক অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, তাকে তিনি যেভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন রাজনীতিতে, সেখানটায় তিনি অনেকেরই উপরে। বিয়াল্লিশ বছর বয়সে এসে বিলিতি পোশাক তথা কোট প্যান্ট টাই ছেড়ে দিয়ে সেই যে তিনি জৈন শ্বেতাম্বর সন্ন্যাসীর বেশভূষা ধারণ করলেন, বাকি সাঁইত্রিশ বছরে তাকে আর পরিত্যাগ করেননি। এর জোরে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি দ্রুত মহাত্মা হয়ে গেলেন (উত্তর ও মধ্য ভারতে মহাত্মা বলতে লোকে যে কোনো সংসার ত্যাগী কৌপীন পরিহিত সাধু-সন্ন্যাসীকেই বোঝে; রবীন্দ্রনাথের কল্পিত অর্থে নয়)। এই দেশের জনমানসে তাঁকে আর কেউ কখনই টেক্কা দিতে পারেননি রাজনীতির সর্বোচ্চ আসনটি দখলে রাখায়।
কীভাবে?
তিনি সত্যাগ্রহ গণ আইন অমান্য ধর্না অনশন ইত্যাদি যে সব কর্মসূচি কংগ্রেসের সামনে রেখেছিলেন, তাতে স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের আপামর জনসাধারণের যোগদান করা সম্ভব হয়ে গেল। সেই থেকে সেই কর্মসূচি আজ অবধি বামপন্থী মার্ক্সবাদী দলগুলোও অবিকল ব্যবহার করে চলেছে। তিনি যে খদ্দর পরা এবং চরকায় সুতো কাটার কর্মসূচি হাজির করলেন, তাতে যে কোনো মানুষের, এমনকি ঘরের পর্দানশিন গৃহবধূদেরও, দেশের জন্য প্রতিদিন (রূপক তাৎপর্যে) কিছু না কিছু করার এক মহৎ অনুভূতি লাভ করার অবকাশ মিলে গেল। গৃহত্যাগী স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে তিনি যে আশ্রম প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন, সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা দেশের কোনে কোনে নিবু নিবু প্রদীপের মতো হলেও জেগে রয়েছে এবং তাঁর মত ও পথের রেশটাকে ধরে রেখেছে। এখানে তিনি আজও অনন্য। তাঁর এই সব ক্ষেত্রে ভূমিকা আজও পূর্ণাঙ্গ ও সশ্রদ্ধ মূল্যায়নের দাবি রাখে।
কিন্তু এই রচনায় গান্ধীজির উপরে বিস্তৃত চর্চার সুযোগ আমার নেই। আলোচ্য প্রসঙ্গে যতটুকু না বললেই নয়, সেই কটা কথাই আমি বলে নিতে চাই। যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সংস্কৃতির বিকাশের পেছনে তাঁরও যে অনিচ্ছাকৃত হলেও বড় মাপের অবদান আছে, যা এযাবত আমরা মার্ক্সবাদীরা প্রায় দেখেও না দেখার ভাণ করে উহ্য রেখে পাশ কাটিয়ে এসেছি, আপাতত সেই দিকটাই আমি আলোচনা করতে চাই।
যখন থেকে তিনি ভারতের রাজনীতিতে যোগ দিলেন (১৯১১), সেই দিন থেকে বরাবর, কংগ্রেসের তিনি নিয়মমাফিক কেউ নন, চার আনার সদস্যও নন; অথচ তিনিই সব, সব কিছু। তিনি সকলকে নিয়ম মানতে বাধ্য করতে পারেন; কিন্তু তাঁকে কেউ প্রশ্ন করতে সাহস পায় না, তিনি কেন সমস্ত নিয়মের ঊর্ধ্বে। কংগ্রেসের যে কোনো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সিদ্ধান্ত তিনি শুধু আত্মশুদ্ধির উপবাসে বসে এবং সম্পূর্ণ মৌন থেকে দুদিকে স্রেফ আলতোভাবে ঘাড় নেড়ে বাতিল করে দিতে পারেন। দেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির পায়ের তলায় লুটিয়ে দেওয়া, বিশ্বাস, শুধুই অযৌক্তিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁর কাছে সকলের হাত জোড় করে নতশির হয়ে থাকা, সকলের কাজের বা আচরণের মূল্যায়ন হলেও তাঁকে সমস্ত মূল্যায়নের বাইরে রেখে চলা—ভারতীয় রাজনীতিতে এই এক সর্বনাশের ঘন্টা সেদিনই প্রথম বেজেছিল। সামন্তবাদী সংস্কৃতিতে আকণ্ঠনিমগ্ন ভারতীয় বুর্জোয়াদের কাছে কোনো নেতা নয়, দরকার ছিল একজন দৈবাচার্য। গান্ধীর মধ্যে তারা সেই সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে তাঁকেই নিজেদের মসিহা বানিয়ে ফেলে।
রাজনীতিতে তাঁর উপস্থাপনা, তাঁর চলাফেরা—সব এইভাবেই নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পঞ্জাবে ভগৎ সিং—এই রকম দু একজন মানুষ ছাড়া গান্ধীর এই অন্ধ গুরুবাদী চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারিতা ও তাঁর ভক্তদের সীমাহীন স্তাবকতার বিরুদ্ধে কেউ সেদিন মুখ খোলেননি, বা বলা ভালো, কিছু বলার সাহস পাননি। রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘদিন গান্ধীর উচ্চতম প্রশংসা করে এসে একেবারে শেষ বেলায় যখন রাজনীতির মঞ্চে তাঁর কিছু কিছু বিসদৃশ ও অনৈতিক আচরণ দেখে দুঃখ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ব্যক্তি গান্ধী এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত—দুইয়েরই ততদিনে অপূরণীয় ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। আর গান্ধী নিজে এই ক্ষতির পরিণাম বুঝেছেন জীবনের একেবারে অন্তিম লগ্নে, সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিচারের কালে। যখন তাঁর পাশে হাত জোড় করে আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। সেই সময় বক্ষ-বিদীর্ণ হাহাকার নিয়ে তিনি পুরোপুরি একা, নিঃসঙ্গ।
আর তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে বঙ্কিমের চেয়েও সোচ্চারে রাম সীতা তুলসীদাস গীতা রামধুন এই সব নিয়ে এলেন। “রঘুপতি রাঘব . . .” তাঁর প্রিয় গান। গীতায়—যেখানে বিপ্লবীরা পেয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রেরণা, সেই গ্রন্থেই তিনি পেতে লাগলেন নিরস্ত্র অহিংস প্রতিবাদের শুলুক সন্ধান। জমিদারি নিয়ে একই বংশের দুই জ্ঞাতিগোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির রক্তক্ষয়ী লড়াইতে তিনি খুঁজে পেলেন ধর্ম-অধর্ম ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে এক রূপক দ্বন্দ্ব এবং আকাঙ্ক্ষিত নৈতিক বল। এইভাবে গীতা বা অন্য কিছুর যে কোনো রকম ভুল বা অপব্যাখ্যার খোলা জমি তিনি চাষ করে ফেললেন। তিনি এমন এক অহিংসার নীতি নিয়ে প্রচারে মেতে উঠলেন, যা শুধু মাত্র ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষিতেই প্রযোজ্য; অন্যত্র নয়। ইংরেজ যদি আফ্রিকায় স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, চিনের সাথে হিংস্র যুদ্ধে নামে, তিনি তখন তাঁর অহিংসার পরাকাষ্ঠা নিয়ে সেই সব যুদ্ধে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থ দিয়ে লোকবল দিয়ে অস্ত্রধারণে রক্তক্ষয়ী গণহত্যায় সাহায্য করতে পারেন। এর মধ্যে যে তাঁর স্বপোষিত অহিংসা নীতির বিপুল বিরোধ আছে তা তাঁর (এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও) বহু কাল চোখে পড়ে না। আর এইভাবেই এক ভ্রান্ত, ফাঁপা, শাঁসহীন ধ্যান ধারণা নীতির প্রচার আমাদের দেশের জনমানসে সহজেই বাসা এবং দিশা খুঁজে পায়। তার জন্য যুক্তি তথ্য বাস্তবতা—কিছুরই দরকার পড়ে না।
এই সমস্ত তথ্যগুলো সামনে ফেলে রেখে এক এক করে মিলিয়ে দেখুন, ১৯২৫ সালে আরএসএস-এর অঙ্কুরোদ্গমের জন্য আর কী বাকি ছিল। চিন্তা বিশ্বাস ধ্যান ধারণা আচার আচরণের দিক থেকে কিছুই আর প্রায় পড়ে ছিল না। শুধু গান্ধীর ক্ষেত্রে যা ছিল খণ্ড খণ্ড উপচার, আরএসএস সেইগুলিকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলে এক সামূহিক বিচার হিসাবে তুলে ধরেছিল। আর সেই বিচার দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে গ্রাহ্য করে তোলার জন্য উর্বর জমি ততদিনে তৈরি হয়েই গিয়েছিল।
অথচ গান্ধী ব্যক্তিগত জীবনে সাম্প্রদায়িক নন। গান্ধীর চিন্তাধারা এমনকি মৌলবাদীও নয়। আরএসএস নাথুরাম গড়সের হাত দিয়ে এটা অন্তত প্রমাণ করে দিয়েছিল। তাঁর ডাকে ব্যাপকতর সংখ্যায় মুসলিম জনসাধারণ সাড়া না দিলেও মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক মানুষ কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অসাম্প্রদায়িক হওয়ার ভ্রান্ত প্রয়াসেও একটা বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি তখন বুঝেছেন, রঘুপতির নামে আহ্বান জানিয়ে সাধারণ মুসলমানদের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি টেনে আনতে পারবেন না। তাহলে কি শ্লোগান পাল্টে ফেলবেন তিনি? না। উলটে বৃহত্তর মুসলিম জনসমাজকে আকৃষ্ট করার প্রয়োজনে তিনি অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করলেন খিলাফত প্রতিষ্ঠার মতো একটা চরম প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনকে। যার লক্ষ্য সেদিন তুরস্কে সদ্য উচ্ছেদ হওয়া মধ্যযুগীয় ইসলামি খলিফাতন্ত্র আবার ফিরিয়ে আনা। এর পরিণাম কী হল? গণ আন্দোলনের পরিধি যতটুকু বাড়ল, তা দুই প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল চিন্তাধারার মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। তাঁর হাত ধরেই এইভাবে সেদিন মুসলিম জনগণকেও ধর্মান্ধতার দিকেই ঠেলে দেওয়া হল। আর ধর্মান্ধতা বৃদ্ধি যে ফাটল বাড়াতেই সাহায্য করবে, এ আর বেশি কথা কী? আবার এই সব প্রয়াসের দ্বারা তিনি এক ধাক্কায় সীমান্ত গান্ধী, কাজী নজরুল ইসলাম, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, কাজী আবদুল ওদুদ, প্রমুখ চিন্তার দিক থেকে প্রাগ্রসর মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের প্রগতির হাতও দুর্বল করে দিলেন।