BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

বাংলাদেশের মানুষের পরাজয় নেই, কারণ তার আছে সংস্কৃতি।

বাংলাদেশে বহু আগে থেকেই নাস্তিকতা চর্চা ছিল, কিন্তু তখন এই অপরাধে নাস্তিকদের খুন করার ট্রেন্ড ছিল না। এই ট্রেন্ড চালু হয়েছে বিশ্বব্যাপী ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের পর থেকেই। ১৯৭৪ সালে দাউদ হায়দারকে কবিতার জন্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর ১৯৯১-১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি বই মেলায় লেখক তসলিমা নাসরিনের বই উঠিয়ে নেওয়া হয়, বাংলা একাডেমি বইমেলায় তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। এমনকী সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত্ও করা হয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার ‘অপরাধে’ তাঁর বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি ও ফাঁসির দাবি তোলে ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহ। তাঁর ফাঁসির দাবিতে সমগ্র দেশে অসংখ্য মামলা রুজু হয়, সরকারও তাঁর বিচারেরও চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি গোপনে দেশত্যাগ করায় সরকারি মামলা-মোকদ্দমা, ঝামেলা থেকে রক্ষা পেয়ে প্রাণে বেঁচে যান। এরপর নাস্তিক ও মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে সমগ্র দেশে ড. আহমদ শরীফের ফাঁসি দাবি করে আন্দোলন গড়ে তোলে ইসলামি রাজনৈতিক দল। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী জঙ্গি সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি মুক্তমনা কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার চেষ্টা চালালেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এর কয়েকবছর পরে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাংলা একাডেমি বই মেলায় অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপরে নৃশংসভাবে হামলা চালানো হয়। এই হামলা ও আক্রমণের ফলে অল্প কিছুদিন পরই তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের সরকার এখনো পর্যন্ত ড. আজাদ হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত ও বিচার করেন নি। এরপর থেকেই মূলত বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার লেখকদের ওপর হামলার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। যা রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও রাজনীতিকদের প্রচ্ছন্ন সহায়তা কিংবা নীরবতার কারণেই ক্রমশ বিশাল আকার ধারণ করেছে।

বস্তুত ইসলামি জঙ্গি বা জিহাদিদের পরিকল্পনায় ব্লগারদের ওপর সাম্প্রতিক হত্যা ও হামলা, একইসঙ্গে সরকার ও রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এবং এমনকী এদের প্রতি প্রশ্রয়মূলক আচরণ, ব্লগার-লেখকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার-নির্যাতনের হুমকি ও হয়রানিমূলক ভূমিকা সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের যে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অনাস্থার জন্ম দিয়েছে তার কারণে ইতোমধ্যেই অনেক মুক্তচিন্তার ব্লগার-লেখক বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন। কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী দেশে সাময়িকভাবে আশ্রয় নিয়েছেন; এবং এখনো অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যাবার চেষ্টা করছেন। এখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এসকল ব্লগার-লেখকরা নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চাকুরী বা উন্নত জীবন কিংবা স্রেফ জীবিকার সন্ধানে পাশ্চাত্যে যাবার সিদ্ধান্ত নেন নি। তাঁরা মূলত নিজেদের নীতি-আদর্শকে রক্ষা করে জীবন বাঁচাবার জন্যই দেশত্যাগ করছেন। তাই তাঁদের দেশ ছেড়ে এভাবে চলে যাওয়াটা অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

যাই হোক, সংক্ষেপে এই আলোচনায় এটুকু অন্তত বোঝা যায় যে, যারা ধর্ম এবং বিশেষত ইসলাম ধর্মের সমালোচক; তারা এই খুনিদের প্রধান টার্গেট হয়েছে। এবং এই ধরনের খুনের পিছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধরনের রাজনীতির সংমিশ্রণও বিদ্যমান। আর এ কারণে মুক্তমনা লেখক-ব্লগারদের কাছে বাংলাদেশ এখন এক শ্বাপদের নাম

কিন্তু সেখানকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ একেবারে ভিন্ন। আমাদের আছে একটি সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, যার মধ্যে রয়েছে মানবতাবোধ ও ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি। আরব দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য তেমন কখনোই ছিল না। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের পাশাপাশি আরও ছিল বামপন্থী ও সাম্যবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন, যা একসময় যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। এই সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে ভালোভাবেই দেখা যাবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মধ্যে দেখা যাবে না।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি মৌলবাদের ক্ষেত্রে অন্য একটি জিনিস দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ধর্মীয় সংগঠন মৌলবাদের চর্চা করলেও পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদানও তার মধ্যে দেখা যায় এবং সেই কারণে তারা জনপ্রিয়ও বটে। যেমন লেবাননে হিজবুল্লাহ অথবা গাজায় হামাস। তারা সশস্ত্রও বটে। ১৯৯৯ সালে ইউএনডিপি এক রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল:

‘বিশ্বজোড়া ভোগবাদী সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক সমসত্ত্বতা গড়ে তোলার জেরে মৌলবাদী তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয় আঞ্চলিক সংস্কৃতিচর্চায় ফের উৎসাহ দেখা দিচ্ছে। রাজনৈতিক আন্দোলনে স্থানীয় সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় রক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্ব পাচ্ছে। মৌলবাদী আন্দোলনগুলোর বিকাশের মধ্যে তা প্রতিফলিত হয়।’

মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বজাতীয় সংস্কৃতি ধরে রাখার ও আত্মপরিচয় তুলে ধরার প্রবণতার মধ্যে জাতীয়তাবাদী উপাদান আছে, যার সঙ্গে ইসলামকে এক করে দেখার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো মৌলবাদী সংগঠন, তা জামায়াত, হেফাজত, জেএমবি—যে-ই হোক, কারও কথায় বা কাজে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদান নেই। জাতীয়তাবাদী উপাদানও নেই। বরং এই ধরনের সব ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতিকেই অস্বীকার করতে চায়। ঠিক এই কারণেই ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনগুলো এই দেশে কোনো গণভিত্তি অর্জন করতে আগেও পারেনি, এখনো পারবে না।

ধর্মীয় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ খুবই বিপজ্জনক। তারা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে। তারা মানুষ খুন করেছে, হয়তো ভবিষ্যতে আরও করবে। তাদের অবশ্যই পুলিশ-প্রশাসন দ্বারা দমন করতে হবে। কিন্তু তাদের পরাজিত করার প্রধান অস্ত্র হলো মতাদর্শ ও সংস্কৃতি। যারা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিই মানে না, তারা কী করে বিস্তার লাভ করবে?

আমাদের এই সংস্কৃতির ভিত্তি বা উৎস ধর্ম নয়, বরং লোকায়ত চিন্তা ও ভাবাদর্শ, যা প্রজন্ম–পরম্পরায় চলে আসছে। সেই চর্যাপদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত। শুধু আধুনিক লিখিত সাহিত্যে নয়, পালা, পল্লিগান, যাত্রা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রকাশ ও বিস্তার আমরা দেখি, যার মধ্যে কিছু ধর্মীয় বিষয় ও কখনো কখনো রাজপুরুষদের কাহিনি থাকলেও (মহাকবি ও শ্রেষ্ঠ নাট্যকার শেক্‌সপিয়ারের নাটকেও রাজরাজড়ার ও ভূত-প্রেতের কাহিনি আছে) মর্মবস্তুর মধ্যে যা প্রধান ছিল, তা হলো মানুষের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উদারপন্থী মতবাদ। ঐতিহাসিক সুজিত আচার্য ‘বাংলায় ইসলাম ধর্মের আদিপর্ব’ নামক রচনায় বলেছেন, এ দেশে ইসলাম ধর্ম বিস্তার লাভ করেছিল তরবারির জোরে নয়, বরং সুফি মতবাদী ধর্ম প্রচারকদের দ্বারা। তাঁদের মতবাদের সঙ্গে এই দেশের শোষিত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাদের সহজিয়া মতবাদের অনেক সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছিল। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের অনেক আগেই যে বৌদ্ধধর্মের সহজিয়া মতবাদ ও বেদবিরোধী লোকায়ত দর্শন জনমনে গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছিল, তার মানবিক দিক ছিল অনেক বেশি। সহজিয়া সাহিত্যে বৈদিক ধর্ম, পৌরাণিক পূজাপদ্ধতি, এমনকি বৌদ্ধধর্মের অনেক আচার-নিষ্ঠাকে কটাক্ষ করা হতো।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে হিন্দু পুনর্জাগরণবাদের প্রবাহ দেখা দিয়েছিল, যার প্রধান প্রবক্তা ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে প্রায় একই সময় নবাব আবদুল লতিফ প্রমুখের নেতৃত্বে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটে, যাঁরা জাতীয়তাবাদের উৎস খুঁজতেন দেশের বাইরে আরব, ইরান ও তুরস্কে। নবাব আবদুল লতিফ মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি মোহামেডান সোসাইটি গঠন করেছিলেন, যেখানে ইংরেজি ভাষার চর্চা হতো, কিন্তু বাংলা ভাষা নিষিদ্ধ ছিল। তখন থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তথাকথিত অভিজাত মুসলমানরা ঘরে উর্দু বলত। পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন সেই আভিজাত্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। জিন্নাহ ও মুসলিম লিগের নেতারা তথাকথিত অভিজাত মুসলমানদের জানতেন ও চিনতেন। সাধারণ মুসলমান জনগণের সঙ্গে পরিচয় ছিল না। তাই বাংলা ভাষাকে তাচ্ছিল্য করার এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার মতো ঔদ্ধত্য দেখাতে পেরেছিলেন, যার উপযুক্ত জবাব তিনি সঙ্গে সঙ্গেই পেয়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকেরাও নানাভাবে চেষ্টা করেছিলেন বাংলা ভাষা বিকৃত করার এবং বাঙালির সংস্কৃতি ধ্বংস করার। কিন্তু পারেননি। কারণ, এই সংস্কৃতির অভ্যন্তরীণ বল অনেক বেশি। বরং পাকিস্তানি ভাবাদর্শ ছিল বড়ই ঠুনকো, তাই তা টিকতে পারেনি।

আমাদের দেশে ধর্মীয় সংস্কারভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন হয়েছিল ইংরেজ আমলেও। ওয়াহাবি আন্দোলন ও ফরায়েজি আন্দোলন ইতিহাসবিখ্যাত। এসব আন্দোলন ইসলাম ধর্মের সংস্কার দিয়ে শুরু হলেও তা ব্রিটিশ রাজবিরোধী ও জমিদারবিরোধী শ্রেণিসংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে পরিণত হয়েছিল। শহীদ বীর তিতুমীর মুসলমান কৃষককে ধর্মশিক্ষা দিতেন, আরবি-ফারসি শব্দে নাম রাখা ও ‘আকিকা’ করার কথা বলতেন। তিনি দাড়ি রাখার গুরুত্বও তুলে ধরেছিলেন। ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা পীর মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া পোশাকপরিচ্ছদে হিন্দু থেকে মুসলমানদের স্বতন্ত্র হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি ধুতিকে হিন্দুর পোশাক বলে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ওয়াহাবি নেতা তিতুমীর অথবা ফরায়েজি আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছিল এসব কারণে নয়। তাদের জমিদারবিরোধী সংগ্রামেই হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে সব কৃষক ও গরিব মানুষ যোগদান করেছিল।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আমাদের সংস্কৃতিতে ধর্মীয় চেতনা কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করেনি। বরং অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি—যা আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে ছিল এবং এখনো আছে, তা খুবই শক্তিশালী। তাই আনিসুল হকের কথার প্রতিধ্বনি করে আবারও বলব, ‘বাংলাদেশের মানুষের পরাজয় নেই, কারণ তার আছে সংস্কৃতি।’

 

আলোচনার প্রারম্ভে প্রাসঙ্গিকভাবেই জানা প্রয়োজন ধর্মীয় মৌলবাদ কী? সকল ধর্মীয় মৌলবাদ হল বাস্তব বর্জিত, যুক্তিহীন, বৈজ্ঞানিক ভাবনা-চিন্তাহীন, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, বিবর্তনের জ্ঞানহীন এক অসুস্থ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মতবাদ। ধর্মীয় মৌলবাদীরা বর্তমানকালে জীবনধারণ করে থাকে, বর্তমানকালের বিজ্ঞান ও সভ্যতার সকল সুযোগ সুবিধাদি ভোগ করে; অথচ সহস্রাব্দকাল আগের কথিত ধর্মীয় সামাজিক আচারাদি যা বর্তমানকালে পুরোপুরি অচল, সেই অচল সমাজ ব্যবস্থাই চালু করতে চায়। সহস্রাব্দকাল আগের প্রাচীন রীতি-নীতি ধর্মবিশ্বাস যে কোন প্রক্রিয়ায় (খুন করে হলেও) সকল মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায়। এইসব ধর্মীয় মৌলবাদীরা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত আচার আচরণের স্বাধীনতা কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কোনও মূল্য দিতে রাজি নয়। যতো গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, যা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে নেই, তার অস্তিত্বই এরা স্বীকার করে না। এদের মতে- ‘সবকিছুই ধর্মগ্রন্থে রয়েছে’। আর ধর্মগ্রন্থে যা নেই মানুষের জীবনে তার দরকারও নাই। মুসলিম ধর্মীয় মৌলবাদীদের উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাপী খিলাফত শাসন প্রতিষ্ঠা করা।যেখানে শরিয়াহ আইনের অধীনে পুরো রাষ্ট্রকাঠামো চলবে। যা আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্র বলে পরিচিত রাষ্ট্রকাঠামোর ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত ও সাংঘর্ষিক।

বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দল থেকে শুরু করে সংবাদ মিডিয়া, লেখক বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে অধিকাংশই অবিশ্বাসীদের সংস্রব এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকছেন। আর এই সুযোগটাই ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী কাজে লাগাচ্ছে। জঙ্গিরা একের পর এক মুক্তচিন্তার লেখকদের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে হত্যা করলেও তারা কেউ-ই কার্যকরী প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ করছেন না, সরকারও সত্যিকারভাবে তাদের দমনের ব্যাপারে আন্তরিক নয়। ফলে জঙ্গিরা দিন দিন আরও সাহসী হয়ে উঠছে। অবস্থা এখন এমনই দাঁড়িয়েছে যে, মৌলবাদী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যারাই মুখ খুলছেন তারাই ‘নাস্তিক’ উপাধি পাচ্ছেন। আর বাংলাদেশে ‘নাস্তিক’ উপাধি পাওয়াকে অধিকাংশ মানুষ ঘৃণার চোখে দেখেন। সমাজে মানুষের বড় একটি অংশ মনে করেন নাস্তিকদের হত্যা করা অন্যায় কিছু নয়।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বাংলাদেশে ইসলামবাদীদের দ্বারা এমন কিছু গুপ্ত হামলা ও হত্যা সংঘটিত হচ্ছে যেগুলোর ধরন এবং টার্গেট এবং প্রকাশ্যে তাদের ঘোষণা দেখে এর পিছনের ইসলামি উৎস ও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। এবং এটাও পরিষ্কার হয় যে, খুনি বা হামলাকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার ও প্রকাশক এবং অতঃপর মূল ইসলামী ধারা বিচ্যুত মুসলমান এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইসলামি মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী এইসব হত্যা, আক্রমণ ও হামলার পিছনে যুক্ত থাকলেও এযাবৎ সংঘটিত কোনও হত্যাকাণ্ডের বিচার এ দেশে হয় নি।

গত বছর (২০১৫) ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামি মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর সবচেয়ে উর্বর সময়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে নৃশংস হত্যার শিকার হন ‘মুক্তমনা’ ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, বিজ্ঞান লেখক, ব্লগার ও গবেষক ড. অভিজিৎ রায়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত একুশে বইমেলায় তাঁর লেখা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে অভিজিৎ রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে প্রকাশ্য জনসাধারণের সামনেই হত্যাকারীরা ধারালো চাপাতি দিয়ে তাঁর মাথা ও ঘাড়ে উপর্যুপরি আঘাত করে তাঁকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটাই ঘটেছিল শত শত মানুষের উপস্থিতিতে, এবং ঘটনাস্থলের অনতিদূরে পুলিশ অবস্থান করলেও অভিজিতের প্রাণ রক্ষার্থে তারা কোন সহায়তা করেন নি। এই ঘটনার সময় তাঁর সাথে বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক, মুক্তমনা ব্লগার, অভিজিতের স্ত্রী, রাফেদা আহমেদ বন্যাও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন। বন্যা আহমেদকে সাধারণ লোকজন হসপিটালে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা করাতে উনি প্রাণে বেঁচে যান।

এরপর ধারাবাহিকভাবে এইসব ইসলামি জঙ্গিদের হাতে ২০১৫ সালের মার্চ মাসের ৩১ তারিখ অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার ওয়শিকুর রহমান বাবু তার নিজের বাসার সামনেই প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন। এরপর অফিসে যাবার পথে সকাল বেলা নিজ বাসার সামনেই বিজ্ঞান লেখক, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে কুপিয়ে খুন করে মে মাসের ১২ তারিখে। এবং ৭ আগস্ট নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নীলয় নীল ওরফে এনসি নীল নিজ বাসভবনে খুন হন। গত বছরের সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল মুক্তচিন্তার লেখককের বই প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা। ৩১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে তাঁকে তাঁর প্রকাশনা সংস্থার অফিসেই জবাই করে খুন করে যায় ইসলামি জঙ্গিরা। একইদিন মুক্তচিন্তার লেখকদের বই প্রকাশক, লেখক ও কবি আহমেদুর রশিদ টুটুল, লেখক ও ব্লগার রণদীপম বসু এবং কবি তারেক রহিমের ওপরও ইসলামি জঙ্গিরা হত্যা করার উদ্দেশে চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করে। এঁরা ৩ জনকে দ্রুত হসপিটালে নিলে সৌভাগ্যক্রমে তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান। একইদিন এঁরা ৩ জন প্রাণে বেঁচে গেলেও জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপন প্রাণে বাঁচতে পারেন নি।

একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ধারাবাহিকভাবে লেখক, ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্টদের ওপর এই আক্রমণের সূচনা হয়েছে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। যিনি অনলাইন প্লাটফর্মে ‘থাবা বাবা’ নামে লেখালেখি করতেন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি এবং ফাঁসীর দাবীতে শাহবাগ চত্বরে ঐতিহাসিক জনবিস্ফোরণের পরেই এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটা শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধাপরাধীদের প্রায় সকলেই ইসলামি মৌলবাদী রাজনীতি ও সাধারণ মানুষ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। এই যুদ্ধাপরাধীরা ছিল প্রধানত জামায়াতে ইসলামি নামক সংগঠনের নেতা-কর্মী। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের জাতিদ্রোহী ও দেশদ্রোহী ভূমিকা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের কঠোর শাস্তির দাবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ শাহবাগে জমায়েত হন। এবং এই জমায়েত ও বিক্ষোভের পিছনে প্রকাশ্যে না এলেও পিছন থেকে ভূমিকা রেখেছিলেন মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগারদের বড় একটি অংশ। বস্তুত এই আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল ব্লগ ও ফেসবুকে অনলাইন একটিভিস্টদের নিজেদের মধ্যে ইনবক্স ও পাবলিক পোস্টে যোগাযোগের মাধ্যমে। বাংলাদেশের আন্দোলনে যা সম্পূর্ণ নূতন ধারার সংযোজন ঘটায়। কারণ ব্লগ ও ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা ঘটে। যা এই দেশে অতীতে কখনও ঘটে নি। এই আন্দোলনের শুরুটা হয় তখনই যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুরুতর যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে আদালত মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। যা ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্টরা প্রত্যাখ্যান করে সে রায়কে ‘প্রহসনমূলক রায়’ হিসেবে অভিহিত করে সরকারের সাথে যুদ্ধাপরাধীদের আপসের অভিযোগ করে। পরবর্তীতে শাহবাগ আন্দোলনের চাপে কাদের মোল্লার রায় রিভিউ করে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্টদের শাহবাগ আন্দোলনের সময় জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি সভাপতি খালেদা জিয়াও ব্লগারদের আন্দোলনকে ‘নাস্তিকদের আন্দোলন’ হিসাবে আখ্যায়িত করে তার বিরোধিতা করেন, জাতীয় সংসদে নাস্তিক ব্লগারদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন। এভাবে ব্লগাররা রাজনৈতিকভাবে সমগ্র দেশের প্রশাসন ও জনগণের নিকট ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলেন। উল্লেখ্য নেতিবাচক প্রচার-প্রপাগাণ্ডার কারণে ইসলামি দল ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ লোকদের নিকট ‘নাস্তিক’ শব্দটি খুবই ঘৃণিত ও অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হয়। তাছাড়াও ইসলামি গোষ্ঠী সবসময়ই নাস্তিকদের ব্লাসফেমি আইনে ফাঁসি দাবি করে আসছে। এমনকী তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলেছে- ‘সরকার যদি নাস্তিকদের ফাঁসি না দেয় তাহলে তারা এইসব নাস্তিক ব্লগারদের জবাই করে খুন করবে’। এ লক্ষে ২০১৩ সালেই তারা ৮৪ জন নাস্তিক ব্লগারের একটি তালিকা সারাদেশে প্রকাশ করে। এই তালিকা ধরে একে একে সবাইকে খুন করা হবে বলেও এইসব ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী বারবার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে। খুন হওয়া ৫ জন ব্লগার-লেখকদের মধ্যে ৪ জনই ৮৪ তালিকাভুক্ত ব্লগার। গুরুতর আহতদের সংখ্যা বাদ দিলেও গত আড়াই বছরে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিদের হাতে খুন হওয়া মুক্তচিন্তার ব্লগার-লেখকদের সংখ্যা এখনো পর্যন্ত ৭ জন।

এটা পরিষ্কার যে, যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁরা বেশিরভাগই ধর্মে অবিশ্বাসী কিংবা নাস্তিক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। নিহতরা সকলেই নিজেদেরকে যুক্তিবাদী ও নিরীশ্বরবাদী হিসাবে দাবী করতেন এবং সকল প্রকার ধর্মীয় অন্ধ বিশ্বাস, গোঁড়ামি, মানবাতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের তীক্ষ্ণধার লেখালেখিই ছিল তাঁদের খুন হবার পিছনের কারণ। এ কারণেই জিহাদি তথা ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী কাপুরুষোচিতভাবে এইসব গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে অাভ্যন্তরীণ জিহাদি বা ইসলামি জঙ্গি রাজনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও খুব শক্ত যোগসাজশ রয়েছে, যার আঁচ পাওয়া যায় ইসলামি দেশগুলোর কর্মকাণ্ডে। বিভিন্ন গবেষকও বিষয়গুলো নিয়ে তাদের দিকে বহুবার অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন। তা সত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকার, রাজনৈতিক দল ও নিরাপত্তা বাহিনীর কেউ-ই এটা দমন করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। জঙ্গিবাদ দমনের পরিবর্তে তারা সবাই মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের দমনে অধিক মনোযোগী। আর এ কারণে কেবলমাত্র বিরোধী দলই নয়, সরকারি দল তথা খোদ সরকারের মধ্যেও কোন কোনও অংশের সঙ্গে এই ধরনের হত্যা-হামলার যোগসূত্র থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষত বিনা শাস্তিতে, বিনা বিচারে যেভাবে অপ্রতিরোধ্যভাবে খুন ও হামলাগুলি হয়ে চলেছে তাতে রাষ্ট্র এবং সরকারের ভিতরেও এগুলির পৃষ্ঠপোষকতা বা কৌশলী সমর্থন আছে, ব্লগাররা বার বার এমন অভিযোগ করে আসছেন। এইসব হত্যা ও হামলার ঘটনায় লক্ষণীয় ব্যাপার হল- সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, যারা বিভিন্ন লেখালেখির মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করে, তাদেরকে হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীদের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও মত-প্রকাশের স্বাধীনতার নামে ভণ্ডামির পরিবর্তে যারা এ দেশে প্রকৃত ধর্ম নিরপেক্ষতার চর্চাকে নূতন একটি মাত্রা দিয়েছিল, তাদেরকে বিনাশ করার মহাপরিকল্পনা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশে যে দেশে শতকরা ৮৯% লোক মুসলিম, সে দেশে নিরীশ্বরবাদী এবং মুক্তচিন্তার মানুষরা নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি অংশ। যে অংশের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বা রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের কোন ক্ষমতাই নেই। তারপরও এই ক্ষুদ্র অংশটি কেন জিহাদিদের প্রধান টার্গেট হল সেটাই ভাবনার বিষয়। প্রকৃতপক্ষে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস থেকে মুক্ত, যুক্তিবাদী এবং মুক্তচিন্তার মানুষরা লোকবাদী বা প্রকৃত সেক্যুলার বাংলাদেশের আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আর সে কারণেই আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো মুক্তমনা ব্লগার, লেখকদের খুনের পিছনে ছায়া হিসেবে ভূমিকা রাখছে। সেই ছায়ার ভিতরে অনেক বড় বড় শক্তির অস্তিত্বও বিদ্যমান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button