ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা নিষেধ
ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি একটি মারাত্মক ব্যাধি, যা আকিদা ও বিশ্বাসকে বিনষ্ট করে ফেলে। এটি একটি জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। কারণ এর ফলে মানুষ আল্লাহর নির্দেশকে লঙ্ঘন করে এবং আল্লাহর বিধান পালনে সীমা লঙ্ঘন করে।একসময় গোটা পৃথিবীতে ধর্মীয় বিভেদ ছিল না। সব মানুষ এক উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আদম ও নুহ (আ.)-এর মধ্যে ১০ শতাব্দীর ব্যবধান ছিল। আর এ দীর্ঘ সময় তারা সবাই খাঁটি মুসলিম ছিলেন। অতঃপর কালক্রমে তারা নেক ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে গিয়ে সীমা লঙ্ঘন শুরু করে। ফলে তাদের আকিদা-বিশ্বাস কলুষিত হয়।
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য যে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা অতিক্রম করো না। অত্র আয়াতে ‘আহলে কিতাব’ বলতে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বোঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ তাদের দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন এবং উম্মতে মুহাম্মদিকেও একই নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-এর উদ্দেশে বলেন, ‘অতএব তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছ সেভাবে দৃঢ় থাকো এবং যারা তোমার সঙ্গে (শিরক ও কুফরি থেকে) তাওবা করেছে তারাও। আর তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের সব কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থেকো। কেননা তোমাদের আগের লোকেরা দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘনের কারণে ধ্বংস হয়েছে।’ রাসুল (সা.) কবরের পাশে কিংবা কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। কেননা মনীষী-বুজুর্গদের কবরের পাশে ইবাদত করলে তা তাঁদের উপাসনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। একবার উম্মে হাবিবা ও উম্মে সালামা (রা.) রাসুল (সা.)-কে হাবশায় (আবিসিনিয়া) অবস্থিত গির্জার কথা বলেন, যাতে কিছু ছবি ও মূর্তি ছিল। তিনি শুনে বললেন, ‘ওরা এমন জাতি যে তাদের মধ্যে কোনো নেককার লোক মারা গেলে তারা তার কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করত এবং তাদের (সম্মানার্থে) সেখানে ছবি ও মূর্তি স্থাপন করত। ওরাই কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে পরিগণিত হবে.
একইভাবে রাসুল (সা.) তাঁর অতিরিক্ত প্রশংসা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা আমার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করো না, যেমন খ্রিস্টানরা মারিয়াম পুত্র ঈসা (আ.)-এর ব্যাপারে করেছে। আমি শুধু আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা (আমার ব্যাপারে) বলো, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।’
ইসলামের মূল উৎস কোরআনে কারিম এবং হাদিস পরধর্মের মানুষকে আপনের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা ও সম্মান করার কথা বলেছে। ইতিহাস সাক্ষী, আমরা দেখেছি শেষ নবী হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আপনজনের অনেকেই ছিল ইসলামের কট্টর দুশমন।
ইসলামের মূল উৎস কোরআনে কারিম এবং হাদিস পরধর্মের মানুষকে আপনের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা ও সম্মান করার কথা বলেছে। ইতিহাস সাক্ষী, আমরা দেখেছি শেষ নবী হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আপনজনের অনেকেই ছিল ইসলামের কট্টর দুশমন।
তথাপি নবী করিম (সা.) তাদের প্রতি নির্যাতন তো দূরের কথা, তাদের প্রতি মৌখিক অভিযোগও উত্থাপন করেননি। বরং কোনো বিরোধী যখন অসুস্থ হতো, তখন হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখতে যেতেন।
হজরত রাসূলে কারিম (সা.)-এর এমন আন্তরিকতায় ওই বিরোধীরাও ধীরে ধীরে ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই যখন মুসলমানের নবীর চরিত্র, তাহলে তারা কীভাবে মন্দিরে হামলা করতে পারে?
একজন প্রকৃত মুসলমানের পক্ষে মন্দির ভাঙ্গা তো দূরের কথা মন্দির ভাঙ্গার চিন্তা করাও সম্ভব নয়। কারণ, ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ডাকে, সাম্প্রদায়িকতার জন্য যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে এবং জীবন উৎসর্গ করে তারা আমাদের দলভুক্ত নয়। ’
সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে পবিত্র কোরআন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ধর্মের ব্যাপারে জোরজবরদস্তি নেই। ভ্রান্ত মত ও পথকে সঠিক মত ও পথ থেকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। ’
সুতরাং ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমাদের ধর্ম আমাদের জন্য। ’
একে অন্যের ধর্ম পালন করতে গিয়ে কেউ কোনোরূপ সীমা লঙ্ঘন কিংবা বাড়াবাড়ি করবে না। অন্য কেউ যদি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেও ফেলে তবে ভুলেও যেন কোনো ইমানদার এ ধরনের হীন ও জঘন্য কাজের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত না করে। এ বিষয়টিই নসিহতস্বরূপ মুমিনদের উদ্দেশে আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব দেবদেবীর পূজা-উপাসনা করে, তোমরা তাদের গালি দিও না। যাতে করে তারা শিরক থেকে আরো অগ্রসর হয়ে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দিয়ে না বসে। ’
যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেওয়া নিষিদ্ধ সেখানে মন্দির ভাঙচুর ও মানুষ হত্যা কীভাবে বৈধ হতে পারে? একজন প্রকৃত মুসলমান কখনোই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত আসে এমন কোনো কাজ করতে পারে না।
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুন্ন করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব। ’
তিনি (সা.) আরও বলেছেন, ‘অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিমকে হত্যাকারী জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ চল্লিশ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেই ওই ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। ’
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে আল্লাহতায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন। ’
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদিনের চিরাচরিত নিয়ম ছিল, যখন কোনো সেনাবাহিনী প্রেরণ করার প্রয়োজন হতো, তখন যুদ্ধ সম্পর্কিত বিভিন্ন নসিহত, দিকনির্দেশনার পাশাপাশি একথা অবশ্যই বলে দিতেন যে, ‘যুদ্ধকালীন সময়ে বা যুদ্ধের পর কোনো মন্দির-গীর্জা-উপাসনালয় ভেঙে ফেলবে না।