BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি

সম্প্রীতি কথাটি বর্তমানে বহুল প্রচলিত। বহুবিধ অর্থে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় সমাজ ও সভ্যতার জন্য খুবই অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হলো সম্প্রীতি; এর প্রায়োগিক ও আভিধানিক নানা অর্থ, মর্মার্থ ও প্রেক্ষাপট থাকলেও মোটামুটি তিনটি বিষয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রথমত, সদ্ভাব- যার মানে হলো প্রণয়, আনুকূল্য, মিত্রতা, সখ্য ও সৌহার্দ্য। এই সদ্ভাবের পরিপূরক গুণাবলির অস্তিত্ব সমাজে বিদ্যমান থাকলেই তা হয়ে ওঠে সম্প্রীতিময়। প্রত্যেক মানুষ যখন একে অপরের প্রতি সমান অনুরাগী হবে, একই পরিমাণ প্রীত থাকবে, তখনই সেখানে সম্প্রীতির প্রত্যাশিত চিত্রটি বাক্সময় হয়ে উঠবে। অর্থাৎ কোনো সমাজে বা দেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সম্প্রদায়নির্বিশেষে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা-ই সম্প্রীতি; আবহমান কাল থেকেই এতদঞ্চলের মানুষের মাঝে ধর্মীয় সম্প্রীতির সদ্ভাব বজায় রয়েছে। যদিও নানা সময়ে এ দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনকে ছিন্ন করার অপপ্রয়াস চলেছে এবং অতিসম্প্রতি বেশ কটি ঘটনার পর বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান- এ চারটিই প্রধান ধর্ম। উল্লেখ্য যে, এ চার ধর্মের কোনোটিই বাংলাদেশের আদি ধর্ম নয়। হিন্দু ধর্মের সঙ্গে এ দেশের মানুষের পরিচয় ঘটেছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে। এরপর বৌদ্ধ ধর্ম এসেছে আড়াই হাজার বছর আগে, ইসলাম ধর্ম এসেছে প্রায় হাজার বছর আগে এবং খ্রিষ্টধর্ম এসেছে প্রায় ৬০০ বছর আগে। জাতীয় কবি নজরুল এ চার ধর্মকেই মমতার বাহুডোরে বেঁধেছেন তার ‘সাম্যবাদী’ কবিতার রজ্জু দিয়ে, ‘যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রিষ্টান।’ আমাদের দেশে মসজিদের পাশে মন্দির, ঈদ এবং পূজা উদযাপন হয় একই সঙ্গে এবং আজানের ধ্বনির পাশাপাশি মন্দিরে বাজে বাঁশরির সুর। আধুনিক লেখক ও কবি সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতায় সেই চেতনাই ফুটে ওঠে, ‘একসাথে আছি, একসাথে বাঁচি, আজো একসাথে থাকবোই, সব বিভেদের রেখা মুছে দিয়ে সাম্যের ছবি আঁকবোই।’

বাংলাদেশের সব ধর্মাবলম্বী মানুষ ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালন করে থাকে তাদের স্ব-স্ব ধর্মীয় উৎসব; একের উৎসবে যোগ দেয় ভিন্ন ধর্মের অনুসারীরাও আর এভাবেই বাঙালির ধর্মীয় উৎসবগুলোও সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। এ দেশে যেমন মুসলিমদের জন্য মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে, ঠিক তেমনি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্যও সরকারি অর্থায়নে মন্দিরভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠাগার চালু রয়েছে; বৌদ্ধ ধর্মগুরু জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্করের নামে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। গঠন করা হয়েছে খ্রিষ্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট আর উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও জাতিগত নানাবিধ কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ও ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত এসব ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষামূলক কেন্দ্রের সরব উপস্থিতি এবং গতিশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির প্রত্যাশিত রূপটিই ফুটে ওঠে। কবি গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার (১৯২৪-১৯৮৬) সেই চেতনার আলোকেই গেয়েছেন: ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি।’

প্রায় হাজার বছর পূর্বে এতদঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটেছিল নির্লোভ ও নির্মোহ চিত্তের সুফি ও অলিগণের মাধ্যমে। যারা আমৃত্যু নিঃস্বার্থভাবে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাদের কাছে রাজা-প্রজা, ধনী-নির্ধন আর সাদা-কালোর কোনো ব্যবধান ছিল না; ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে তারা কাউকে অসম্মান করেননি, বরং মহান প্রভু-নির্দেশিত হেকমত, কৌশল ও প্রজ্ঞার সঙ্গে জনমানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত তুলে ধরেছেন। তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহার, উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং খোদাপ্রদত্ত অলৌকিক ঘটনাবলির মাধ্যমে অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে এ দেশে ইসলাম প্রসার লাভ করে। বাগদাদ, খোরাসান, মক্কা, ইয়েমেন, দিল্লি, মুলতান- এর মতো দূর-দূরান্ত হতে বহু সাধক বাংলায় এসে বসতি স্থাপন ও ধর্ম প্রচার করেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে তারা খোদার সেরা সৃষ্টি মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

আমাদের পূর্বসূরি অলি-সুফিগণ সব ধর্মমতের মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও মর্যাদা লাভে ধন্য হয়েছেন; তাদের মাজারসমূহ আজ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে, যেখানে সব ধর্মের লোকেরা এসে থাকে এবং তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়। সুফিরা নৈতিকতার শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে সব ধর্মমতের অনুসারীদের একত্রিত করতে পেরেছিলেন, সর্বজনীন ভালোবাসার অনুপম সৌধ নির্মাণ করে তারা এতদঞ্চলে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির নজির স্থাপন করেছিলেন। বাংলাদেশ একমাত্র মুসলিমপ্রধান দেশ, যার সীমান্তে আর কোনো মুসলিম দেশ নেই। ফলে বিপুলভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এর পেছনে সুফিদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। সুফিদের অলৌকিকতায় বিস্মিত হয়ে দলে দলে লোকেরা তাওহিদের পতাকাতলে আশ্রয় নিতে থাকে। তাদের ব্যক্তি-মাধুর্য, নৈতিক চরিত্র আর আচার-ব্যবহারে অজস্র বনি আদম মুগ্ধ হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে সমবেত হয়। ধর্মের কল্যাণকর দিকটি, উদারতা, মহানুভবতা ও পরিশীলিত রূপটিই মানুষের সামনে এবং সমাজের সংশোধনে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির সুদীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চক্রান্ত ও ধর্মীয়-জাতিগত দ্বন্দ্ব-সংঘাত যে হয়নি, তা কিন্তু নয়। পবিত্র ধর্ম ইসলামকে মানুষ ও মানবতার খেদমতের পরিবর্তে যখনই ব্যক্তিস্বার্থ বা দল-গোষ্ঠীগত ফায়দা হাসিল অথবা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তখনই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই দেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জনপদে ইসলামের চিরন্তন উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও পরধর্মের অনুসারীদের প্রতি দায়িত্বশীলতার বিষয়টি বিস্মৃত হয়ে যখনই গোঁড়ামি, অন্ধত্ব ও কায়েমি স্বার্থ এসে ভর করে, তখনই অমুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতিত হয়, উপাসনালয় আক্রমণের শিকার হয় এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে অমুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের চিত্রাবলি তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। কিন্তু এসবের পরেও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বাংলাদেশ বার আউলিয়ার দেশ, সুফিদের দেশ, এ দেশ অধ্যাত্মবাদী মুনি-ঠাকুরের দেশ। এই দেশের মানুষের চরিত্র বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে সমুদ্রের উদারতা, অরণ্যের সহনশীলতা এবং অন্তরীক্ষস্থিত মহাজ্ঞানের প্রভাব। আর জ্ঞানের গভীরতাই আমাদের সত্যিকার ঐক্য এনে দিতে পারে এবং সবার মাঝে সম্প্রীতি স্থাপন করে দিতে পারে।

বাংলার আকাশ, বাংলার বাতাস, বাংলার মাটি, বাংলার কাদা ও বাংলার ষড়ঋতু কথা বলে। এদের কথা যারা ‘আহলে দেল’ তথা অন্তর্জগৎ যাদের সমৃদ্ধ, যারা আত্মার খবর রাখেন, তাদের নিকট বোধগম্য হয়। এ দেশের হাওর-বাঁওড়, নদ-নদী ও সমুদ্র মানুষের হৃদয়ে অতীন্দ্র অনুভূতির সাড়া দেয়। তাই ধর্মীয় সম্প্রীতি যেকোনো মূল্যে এদেশে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। ভারতীয় এক নবীন কবির কাবিতাংশ দিয়ে শেষ করি, ‘মোদের দেশে যদি মোরা রাখি সম্প্রীতি, সুখে শান্তিতে থাকব আমরা সকল জাতি।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button