মুসলমান রাজত্বের অনেক আগে থেকেই ভারতে দেবস্থান ভাঙা এবং দখল করার কাজ হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেরাও করে এসেছে
এরই পরিণামে আমরা একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলাম: যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের এত শক্তি ছিল না, এত বড় বড় প্রভাবশালী নেতা দেশের বুকে উপস্থিত ছিল না, সেই সময় ১৯০৫-১১ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন কিন্তু সফল হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসক কার্জনের ষড়যন্ত্র প্রায় ব্যর্থ হয়েছিল। আর, স্বাধীনতা আন্দোলন যত এগিয়েছে, যত তার শক্তি বৃদ্ধি হয়েছে, যত গান্ধী নেহরু পটেল পন্থ প্রমুখ নেতাদের ব্যক্তিগত প্রভাব জনমনে বেড়েছে, ততই তার মধ্যে ফাটল ধরেছে, সেই ফাটল বড় হয়েছে, এবং অবশেষে ১৯৪৭-এর অর্ধবর্ষ শেষে দেশকে দুই (আসলে তিন) টুকরো করে স্বাধীনতা পেতে হয়েছে। অর্থাৎ, গান্ধী নেতৃত্বের যেটা শক্তি বলে এতকাল ভাবা হয়েছে, প্রচার হচ্ছে, তা আসলে জাতীয় জীবনের এক মরীচিকা। দুর্বলতারই ছদ্মরূপ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এই নির্মল সুতীক্ষ্ণ রসিকতাটিকে অনেকেই বোধ হয় আজ পর্যন্তও লক্ষ করে উঠতে পারেননি।
আর, না বুঝে বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে, এই যে দুষ্ট উদাহরণটি গান্ধী একবার খাড়া করে গেলেন, হাজারও ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও এটাই ভারতীয় জাতি-রাজনীতি এবং জাতীয় রাষ্ট্রের চিরস্থায়ী অঙ্গভূষণ হয়ে রইল। অসাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার একমাত্র অর্থ দাঁড়িয়ে গেল, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিকৃষ্ট রক্ষণশীল উপাদানগুলির মধ্যে উদার ভ্রাতৃত্ব। কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে নেহরুর পছন্দের তালিকায় শেখ আবদুল্লাহ নয়, উঠে এল বক্সি গোলাম মহম্মদ। রাজীব গান্ধীর মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পেল শাহবানু মামলার বিচারালয় প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রক্ষণশীলদের চাপে মুসলিম পার্সোনাল ল-কে আরও নারী বিরোধী করে তোলার মধ্যে।
আর আপাতত সর্বশেষ যে ঘটনাটির উল্লেখ করতে চাই, সেইটি এর মধ্যে সবচেয়ে খাসা। রাজীব গান্ধীর কংগ্রেসকে পরাস্ত করে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এর নেতৃত্বে যে জনতা সরকার গঠিত হল, তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী করা হবে একজন মুসলিম ব্যক্তিকে—এই মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরামর্শ নিতে তাঁরা চললেন—কোথায় জানেন? দিল্লির জামা মসজিদের ইমাম বুখারির কাছে। তাঁদের হাতে ছিলেন দুজন ক্যান্ডিডেট—আরিফ মহম্মদ খান এবং মুফতি মহম্মদ সঈদ। বুখারি তাঁদের বললেন, আরিফ কস্মিনকালে নয়। ও কোনো মুসলমানই নয়। ও শাহবানু মামলায় আদালতের রায়ের পক্ষে ছিল, রাজীব গান্ধীর মুসলিম নারীর অধিকার (রক্ষা) বিলের ও বিরোধিতা করেছিল। শরিয়তের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। ওকে মন্ত্রীসভায় নেওয়া যাবে না। মুফতি? হ্যাঁ, ওকে করা যাবে। ও পাঁচবার নামাজ পড়ে, খাঁটি ঈমানদার লোক, সাচ্চা মুসলিম। তা, সেবার সেই মুফতি মহম্মদ সঈদকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রিত্ব দেওয়া হল। গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত সেই ঐতিহ্য সমানে চলেছে।
একটা ছোট পাদটীকা দিয়ে রাখা ভালো: সেই ঈমানদারের কন্যা মাহবুবার নেতৃত্বাধীন দলের সাথেই এখন কাশ্মীরে বিজেপি-র সুদৃঢ় আঁতাত। নিশ্চয়ই তারও কিছু গূঢ় কারণ আছে! আরও আশ্চর্যের কথা হল, যে শরিয়তি আইন নিয়ে বিজেপি-র ব্যাপক বিক্ষোভ আছে, মাহবুবার দল কিন্তু সেই শরিয়তের একনিষ্ঠ সমর্থক। অর্থাৎ, খাঁটি মৌলবাদী হতে পারলে, ধর্ম নির্বিশেষে হাতে হাত দিব্যি মিলে যায়!
তাই বলছিলাম, এই সমস্ত আপসই শেষ পর্যন্ত সঙ্ঘ পরিবারের হাত শক্ত করেছে। তার সাংগঠনিক শক্তি কম বা বেশি যেমনই হোক না কেন, তার আদর্শগত জমি এই রাষ্ট্র এবং তার রাষ্ট্রনায়কদের হাতেই ক্রমাগত পাকাপোক্ত হয়ে চলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের অজান্তে; কখনও কখনও হয়ত জেনে-বুঝেই। জনসাধারণের মধ্যেও তাদের প্রচার ক্রমাগত ছাপ ফেলে চলেছে। এর ফল হয়েছে দুটো: যখন তখন দেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানি লাগিয়ে দেবার মতো পরিস্থিতি প্রস্তুত হয়েই থাকে; যাকে বলা যেতে পারে সক্রিয় সাম্প্রদায়িকতা (active বা hard communalism)। আর, যখন দাঙ্গা হাঙ্গামা হচ্ছে না, তখনও তার সপক্ষে একটা মতবাদিক আদান-প্রদান “ওরা-আমরা” সমস্ত দেশ জুড়েই চলতে থাকে; একে আমি বলতে চাই নিষ্ক্রিয় সাম্প্রদায়িকতা (passive বা soft communalism)। এই প্রায়-অদৃশ্য সার্বক্ষণিক নিষ্ক্রিয় সাম্প্রদায়িকতাই আমার মতে বেশি বিপজ্জনক। আসল বিপদ।
[৬] ভারতীয় সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা: আরও কিছু ভ্রম নিরসন
স্বাধীন ভারত কি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল? অনেকেই মনে করেন—তার মধ্যে বহু বামপন্থী এবং মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবীও পড়েন—হ্যাঁ, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট শেষে স্বাধীনতার সেই রক্তমাখা ধূসর রাত্রিতে পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করেছিল এক ইসলামিক রাষ্ট্র রূপে, কিন্তু স্বাধীন ভারতের জন্ম হয়েছিল নাকি এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবেই। তাঁরা এর জন্য পণ্ডিত নেহরু প্রমুখ কংগ্রেসের একটা বড় অংশকে বেশ প্রগতিশীল বলেও মনে করেন। যার অর্থ হল, এই ব্যাপারেও প্রকৃত ইতিহাস কী বলে তাঁরা তার কোনো খোঁজখবর রাখেন বলে মনে হয় না। অথবা, জানলেও চেপে যান।
এই ব্যাপারে প্রথম হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেন ভারতের প্রথম এবং সুদীর্ঘ সময়ের (১৯৫০-৬৩) অ্যাটর্নি জেনারেল, ভারতের প্রথম ল কমিশনের চেয়ারম্যান (১৯৫৫-৫৮), পদ্মবিভূষণ, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, মোতিলাল চিমনলাল শেতলবাদ। আকাশবাণী দিল্লি কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর ১৯৬৫ সালের এক বেতার বক্তৃতায় তিনি বলেন, “প্রকৃত অর্থে ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা বোধ হয় ভুল হবে।” [Setalvad 1967, 20] তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে সংবিধান রচনা পরিষদে দু-দুবার এই শব্দটি ঢোকানোর প্রস্তাব উঠেছিল, দু-বারই তা সংখ্যাধিক্য ভোটে বাতিল হয়ে যায়। [Ibid, 21] আসলে এই শব্দটি সংবিধানের ভূমিকায় জায়গা পায় ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়, যখন ইন্দিরা গান্ধী তাঁর স্বৈরাচারী রাজকে সমাজতান্ত্রিক কথামালায় সাজিয়ে তুলছিলেন নানাভাবে। বোঝাই যায়, দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ তৈরি করার চাইতেও তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল নিজের এক প্রগতিশীল ভাবমূর্তি নির্মাণের দিকে। কেন না, সংবিধানে শব্দটির প্রবেশের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পঞ্জাবে উগ্রপন্থী শিখ সন্ত্রাসী ভিন্দ্রানওয়ালাকে ধীরে ধীরে পেছন থেকে মদত দিয়ে অকালি দলকে ভাঙার আয়োজন করতে থাকেন। অন্য দিকে সেই সন্ত্রাসকে দেখিয়ে দেশের অন্যত্র তিনি প্রচ্ছন্নভাবে নিজের জন্য এক হিন্দুপ্রীতির ছবি আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সারা দেশের বুকে সংসদীয় রাজনীতিকে এইভাবে খুল্লমখুল্লা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ভরিয়ে তোলা সম্ভব হয় এই শব্দটির গম্ভীর সাংবিধানিক অস্তিত্বের মধ্যেই।
প্রয়োগের দিক থেকে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের সামনে জন্ম লগ্নেই একটা সুযোগ এসে পড়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের পার্থক্য তুলে ধরার। নতুন সংবিধান চালু হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি। তার ঠিক এক মাস আগে, ১৯৪৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদল সাম্প্রদায়িক জঙ্গি হিন্দু কুচক্রী চারপাশে পুলিশ প্রহরা থাকা সত্ত্বেও শেষ রাতে বাবরি মসজিদের মধ্যে রাম-সীতা-লক্ষ্মণের মূর্তি ঢুকিয়ে রেখে আসে। পরদিন সকালে তারাই প্রচার শুরু করে দেয়, রামচন্দ্র নিজেই “জন্মস্থান” দখল নিতে চলে এসেছে। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই পটেল। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন গোবিন্দবল্লভ পন্থ। তাঁর আর এক সহমন্ত্রী ছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। এই সব বাঘা বাঘা নেতারা মসজিদ দখল ও অপবিত্র করার বিরুদ্ধে সেদিন অনেক গরম গরম কথা বলেছিলেন। আর আরএসএস তখন গান্ধী হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত। কিন্তু ফৈজাবাদ জেলার জেলাশাসক ও রাজ্যের বিচারবিভাগ হিন্দু মৌলবাদীদের পক্ষ নিয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ করে দেয় এবং হিন্দুদের পেছন দরজা দিয়ে ঢুকে রাম পূজার অনুমতি দিয়ে দেয়। কংগ্রেসের সমস্ত নেতাই তখন হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। লক্ষ করে দেখলেই বোঝা যাবে, নব স্বাধীন পাকিস্তানের সঙ্গে সদ্য স্বাধীন ভারতের পার্থক্য রইল শুধু এই জায়গায় যে ওরা যে কাজগুলো অত্যন্ত হৈ-হুল্লোর করে করতে পারে এবং করেও থাকে, ভারতে ঠিক সেই কাজগুলোই করা হয় কিঞ্চিৎ আড়াল আবডাল রক্ষা করে। যদিও, আজ সেই আড়ালটাও আর মৌলবাদীরা রাখতে চাইছে না বা পারছে না।
আরও উদাহরণ আছে।
স্কুলে ভর্তি হতে গেলে একটা সরকারি কাগজে আমাদের ধর্ম জাত ইত্যাদি লিখতে হয় (আজকাল অবশ্য এটা আর আবশ্যক থাকছে না)। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েও তাই। আপনি ইতিহাস বিজ্ঞান সাহিত্য পড়বেন, তার সাথে আপনার কী জাত কী ধর্ম, তার সম্পর্ক কী? ইংরেজদের দেখানো পথেই এই স্বাধীন দেশে বেনারসে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আর আলিগড়ে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় টিকে রইল। এবং সেই দুটোই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। দিল্লির কায়দায় পশ্চিম বঙ্গে বামফ্রন্টের আমলেও মুসলিমদের জন্য আলাদাভাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে মুসলিম প্রীতির নমুনা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। কলকাতার বুকে আজ অবধি হিন্দু হোস্টেলে মুসলিম ছাত্র বা বেকার হোস্টেলে হিন্দু ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করা গেল না। ইংরেজদের রেখে যাওয়া সেই উত্তরাধিকার আমরা আজও আমাদের সেক্যুলার কাঁধে দিব্যি বহন করে চলেছি। এমন নয় যে কোথাও এই ঐতিহ্য আমরা ভাঙতে পারিনি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রহোস্টেলগুলিতে এটা সম্ভব হয়েছে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলিতে এটা সম্ভব হল, বিশ্বভারতীতেও এটা করা সম্ভব হয়েছে। শুধু এখানে, ভারতীয় রেনেশাঁসের ভেনিস খোদ কলকাতার বুকে কেন এটা সম্ভব হল না—কেউ কি কেউ কখনও ভেবে দেখেছেন? সত্যিকারের অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলে কোনো দেশে এইসব জিনিস সম্ভব হয়?
দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি সংখ্যালঘু অধিকারের নামে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এটার দ্বারা আসলে সংখ্যালঘুদের কিছু বাড়তি অধিকার দেবার নামে তাদের ধর্মীয় পশ্চাদপদতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে মুসলমান জনসাধারণকে চিরকালের জন্য জাতীয় মূলস্রোত থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে, প্রান্তবাসী করে দেওয়া হয়েছে। অথচ, যদি দেখা যায়, ইসলামি শরিয়তে সত্যিই এমন কিছু বিধিবিধান আছে যা আধুনিক সমাজ নির্মাণেও কাজে লাগতে পারে (থাকতেই পারে, আমার এটা ভালো করে জানা নেই), তাহলে তা সাধারণভাবে সকলের জন্য গ্রহণ করলেও তো ভালো হত। ভারতের সংবিধান রচয়িতারা ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়ার সংবিধান বা সাংবিধানিক প্রকরণ থেকে অনেক কিছু যেমন নিয়েছেন, তেমনই ভালো বুঝলে ইসলামি শাসনপদ্ধতির প্রকরণ থেকেও কিছু জিনিস নিতে পারতেন। তাতে অন্তত সেক্যুলারপন্থীদের তো আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং দেশের সামনে শুভবুদ্ধি ও যুক্তিপরায়ণতার একটা সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেত। আসলে ভালোমন্দ বিচার তো নয়, মুসলমানকে মুসলমান করে রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিসাবেই এগুলো যে করা হয়েছে তা আর কতজন এপর্যন্ত ভেবে দেখেছেন?
এর ফলে যে হিন্দু বা অপরাপর নারীদের সাথে মুসলিম নারীদের অধিকারের তারতম্য ঘটে গেল তা তাঁরা খেয়াল করেননি। মুসলিম আইনে পুরুষের বহুবিবাহ এর ফলে সংবিধান অনুমোদিত ও আইনসিদ্ধ হয়ে যাওয়াতে হিন্দু ও মুসলিম নারীর অধিকারের মধ্যে বিপুল অসাম্য এসে গেল, সংবিধানের অন্যত্র প্রদত্ত নারী-পুরুষ মৌলিক সমানাধিকারের ধারার সাথে মুসলিমদের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর অধিকারের বৈষম্যের বিরোধ হয়ে গেল—এগুলোও তাঁরা ধরতে পারেননি। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও মুসলিম নারীদের অধিকার হিন্দু বা অপরাপর সম্প্রদায়ের নারীদের তুলনায় সঙ্কুচিত হয়ে পড়ল; আবার মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের প্রশ্ন আরও একটা জায়গায় (বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে) ধাক্কা খেল। ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সমস্ত ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে বয়ে বেড়াবার যে ভ্রান্ত সাংবিধানিক নীতি সেদিন গৃহীত হয়েছিল, তারই জের হচ্ছে এই সমস্ত বিচিত্র বিধান। ইন্দিরা গান্ধী যখন সংবিধানের ভূমিকায় এই শব্দটি জুড়ে দিলেন, তখন তাঁরও মনে হয়নি যে সংবিধানের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী এই সব বিষম বিধানগুলিকে নিয়েও তাঁর কিছু করার আছে। আসলে শব্দই তো ব্রহ্ম। বাকি সবই মায়া। অত ভেবে কাজ কী?
এই দুর্বলতা আমাদের রাজনৈতিক জীবনকে চারদিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। নির্বাচনের প্রার্থীরা সাধু বাবা-মায়েদের পদসেবা করেন, চরণামৃত পান করেন, গণ মাধ্যমে তার ব্যাপক প্রচার হয়। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রচুর ঢাকঢোল পিটিয়ে তিরুপতি মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসেন, মাথা ন্যাড়া করে বহুমূল্য চুল দান করে ফেলেন, গণমাধ্যমে তার তড়িৎ-খবর হয়। বড় বড় নেতারা দুই হাতের আট আঙুল ভর্তি করে রঙ-বেরঙের আংটিপাথর পরে ঘুরে বেড়ান। এমএলএ এমপি প্রার্থী পদের ফর্ম জমা দেওয়া, জিতলে শপথ গ্রহণ—সবই তাঁরা করেন নিজেদের আস্থাভাজন বিশিষ্ট জ্যোতিষীর পরামর্শমতো পাঁজিপুঁথি শুভাশুভক্ষণ দেখে। তারও তুমুল প্রচার হয়। কী করে এগুলো একটা আধুনিক সমাজে সম্ভব হয়?
একই দেশের অনেকগুলো রাজ্যে (যেমন, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, ইত্যাদি) ধর্মের নামে গোবধ আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ। এইভাবে দেশেরই এক বিরাট সম্প্রদায়ের মানুষদের তাদের স্বাভাবিক খাদ্য উৎস থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখানে যে সংখ্যালঘুর খাদ্যাভ্যাস (জীবন-ধারণ)-এর মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত সাংবিধানিক ধারাগুলি লঙ্ঘিত হল, তা আর কেউ খেয়াল করছে না। হয়ত এরই জবাবি নিদান হিসাবে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক শুক্রবার বেলা বারটা থেকে দুটো পর্যন্ত শুধু যে ক্যান্টিনগুলি বন্ধ থাকে তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত জলের লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে ক্যাম্পাসের ভেতরে কোথাও কোনো চায়ের দোকানও ওই দু ঘন্টা চলতে না পারে। এই সবও যে বিপরীতভাবে অমুসলিম (বা এমনকি ধর্মে অবিশ্বাসী মুসলিম) পরিবারের ছাত্রছাত্রী কর্মচারি এবং শিক্ষকদের (এবং সেই সময় কোনো কাজে ক্যাম্পাসে আসা অভিভাবক-অতিথিদের) সংবিধান-প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ভঙ্গ করার সামিল, তাও আর কেউ ভেবে দেখছে না। এই সব তথ্যের নিরিখে মাঝে মাঝেই আমার খুব সন্দেহ হয়, আমরা ভারতবাসীরা আজও কোন যুগে পড়ে আছি। নিজেদের চার বছর ধরে অনেক ভাষণবাজি তক্কাতক্কি করে বানানো একটা ইয়াব্বড় দলিলের এক অধ্যায়ের নির্দেশাবলির সাথে আর এক অধ্যায়ের হুকুমনামার নিজেরাই খটামটি লাগিয়ে দিই। এবং সেটা কখনও বুঝে উঠতেই পারি না। ধারার পরা বদলায়, সংশোধন হয়, কিন্তু সেই খটাখটির জায়গাগুলো বহাল তবিয়তে থেকে যায়!
আর আমি আবার বলছি—এই সমস্ত পশ্চাদপদ রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল বিধানগুলির কোনোটাই সঙ্ঘ পরিবারের তত্ত্বাবধানে বা তাদের হাতে সম্পন্ন হয়নি। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলির নেতৃত্বে অধীনে ও উদ্যোগেই এই সব ভ্রান্ত ও অন্যায় পদক্ষেপ বহু দশক ধরে ধাপে ধাপে নিষ্পন্ন হয়ে চলেছে। আরএসএস কোম্পানি শুধু এর থেকে যথাযোগ্য ফায়দা নিতে পেরেছে এবং নিয়ে যাচ্ছে।
[৭] ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িকতা
আজ আমরা বামপন্থী মার্ক্সবাদী ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক সকলেই বিজেপি-র শিক্ষানীতি নিয়ে চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন। প্রচুর সমালোচনাও করছি। তার যথার্থ কারণও আছে। কিন্তু—এই জায়গায় ঢোকার আগে আমি একটা প্রশ্ন তুলতে চাই—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি এতকাল, বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে, জওহরলাল নেহরু ইন্দিরা গান্ধীর দীর্ঘ আমলে, সব কিছু ঠিকঠাক ছিল? সেখানে কি জাতীয় ইতিহাসের সমস্ত প্রকরণগুলোকে আগে যে ত্রুটিগুলির কথা আমি উল্লেখ করেছি তার থেকে মুক্ত করা হয়েছিল?
এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে, না।
এযাবতকাল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ইংরেজদের দিয়ে যাওয়া উত্তরাধিকার প্রায় একশ শতাংশই বহাল ছিল। আমাদের দেশের স্কুল স্তরের ছাত্ররা ভূগোলের সমস্ত পাঠ নেয় ক্লাশরুমে বসে বসে। তারা মাঠে দাঁড়িয়ে পূর্ব-পশ্চিম চেনে না, বায়ুপ্রবাহের দিক নির্ণয় শেখে না, মেঘ চিনতে শেখে না, কোনো গ্রহ তারা—যেগুলি খালি চোখেই প্রায় চেনা যায়—চিনতে শেখে না। আমাদের দেশের ছাত্রদের মধ্যে গণিতের সম্পর্কে প্রায় একটা জন্মগত ভীতি কাজ করতে থাকে। আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যে হাতেকলমে কাজ করার অভ্যাস তৈরি করে দেওয়া হয় না। আমাদের ছাত্রদের মধ্যে ভাষা শিক্ষার প্রকরণ প্রায় মধ্য যুগের পদ্ধতিতেই পড়ে আছে। সারা পৃথিবীতে ভাষা শিক্ষা নিয়ে, বিদেশি ভাষা শিক্ষা নিয়ে যে এত পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে, গবেষণা চলছে—তার সামান্যও কোনো ছাপ নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে একটা চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক অবৈজ্ঞানিক ভাষানীতি সরকারিভাবে গৃহীত ও স্কুলে স্কুলে প্রযুক্ত হয়ে চলেছে। এইগুলোর কোনোটাই কিন্তু বিজেপি এসে চালু করেনি। করার মতো অবস্থায় এতকাল তারা ছিলই না। তারা এগুলো আজ তৈরি অবস্থায় পেয়েছে এবং এখন তার সদ্ব্যবহার করতে চলেছে।
আমাদের দেশে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইতিহাসে শিক্ষায়। সঙ্ঘ পরিবারের সরাসরি হস্তক্ষেপের বহুকাল আগে থেকে সিলেবাস এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে ইংরেজদের শেখানো কথা মুখস্থ করেই আমরা স্বাধীন ভারতেও ইতিহাস বইতে একপেশেভাবে পড়ে আসি: মুসলিম রাজত্বে ধারাবাহিকভাবে হিন্দুদের উপরে ধর্মীয় নির্যাতন করা হয়েছে, হাজার হাজার মন্দির ভেঙে দেওয়া হয়েছে, হিন্দুদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। ফলে অধিকাংশ ভারতীয় যখন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হয়ে ওঠে, এই ধারণাগুলি তার মনে প্রায় স্বতঃসিদ্ধের মতো কাজ করতে থাকে। তার পরেও যদি সে মুসলমানদের প্রতি সহিষ্ণুতা দেখায় সে তার নিতান্তই উদারতা। কিন্তু যে তথ্যগুলি তাকে কখনও শেখানোই হয় না আমি এখানে তার কিছু কিছু তুলে ধরতে চাই:
১) মুসলমান রাজত্বের অনেক আগে থেকেই ভারতে দেবস্থান ভাঙা এবং দখল করার কাজ হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেরাও করে এসেছে। হাজার হাজার বৌদ্ধমঠ এক সময় হিন্দুরা দখল করে মন্দির বানিয়ে ফেলেছে। [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৯/২৮] এমনকি, পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরও এক সময় একটা বৌদ্ধমঠ ছিল। [বিবেকানন্দ ১৯৮৬; ৬/১২৯, ৯/৭২] স্বামী বিবেকানন্দের রচনা থেকেই আমি প্রথম এই তথ্যটি পাই। এবং হিন্দু রাজারা শুধু যে বৌদ্ধমঠ ভেঙেছেন বা দখল নিয়েছেন তাই নয়, তারা অনেকেই হিন্দু মন্দিরও ভেঙেছেন, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি চুরি বা লুট করে এনে বিলাসিতার পাথেয় সংগ্রহ করেছেন। [Sharma 1990] সঙ্ঘপরিবার রামমন্দির বা মধ্য যুগের ইতিহাস নিয়ে বেশি খোঁচাখুঁচি না করলে আজও হয়ত এই সব তথ্য আমাদের অজানাই থেকে যেত। আমি বরং বিজেপি কোম্পানিকে ধন্যবাদ দিই, আমাদের দেশের অন্ধকারে পড়ে থাকা এই সব তথ্য আমাদের জানতে সাহায্য ও প্ররোচিত করার জন্য।
২) এই প্রশ্নটা নিয়ে কতজন ভেবেছেন, যে দেশে বুদ্ধদেবের জন্ম, বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি, প্রায় সারা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সেই ধর্ম কেন সেই ভারতের বুকেই প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রশ্নটা অন্তত উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু না তিনি, না অন্য কেউ এই নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান চালিয়েছেন। কেন করেননি তার আমি কেবলমাত্র আন্দাজ করতে পারি: সন্ধানের ফলটা হয়ত অনেকের কাছেই ঠিক সুস্বাদু লাগবে না। দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন, বৌদ্ধদের উপর নির্যাতন করার জন্য শঙ্করাচার্য নাকি সঙ্গে নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ঘুরতেন। [সেন ১৯৩৫, ১/৯; বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৯/৭২] গয়ায় “বোধিদ্রুম” নামক যে বোধিবৃক্ষের নিচে বসে গৌতম “বুদ্ধ” হয়েছিলেন বলে বৌদ্ধদের বিশ্বাস, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কর আমলে তার গোড়া শুদ্ধ কেটে ফেলা হয় (এখন সেখানে যে গাছটি দেখা যায়, সেটা অনেক পরে শ্রীলঙ্কা থেকে চারাগাছ এনে বসানো হয়েছে)। [অপূর্বানন্দ ১৯৭৮, ৭২-৭৩] বৌদ্ধ পুঁথিগুলি এই দেশ থেকে সম্পূর্ণ লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পূজারিণী’ কবিতায় লিখেছেন,
“অজাতশত্রু রাজা হল যবে পিতার আসনে আসি’,
পিতার ধর্ম শোণিতের স্রোতে,
মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হতে,
সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলোতে বৌদ্ধ-শাস্ত্র-রাশি।”
গুপ্ত যুগে ইলোরা-অজন্তার মতো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পাথর কেটে কেন বৌদ্ধদের সঙ্ঘারাম বা আশ্রয় বানাতে হয়েছিল, এরও উত্তর একজন আধুনিক ইতিহাসবিদকে খুঁজে দেখতে হবে। এবং মনে রাখতে হবে, বৌদ্ধদের ভারত ছাড়া করার কাজটাও বিজেপি-র লোকেরা এসে করেনি। মুসলিমদেরও ভারতে আগমনের অন্তত পাঁচশ বছর আগে এই কুকম্মটি প্রায় সুসম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।
৩) এটা ঠিক যে মুসলিম আমলে বেশ কিছু হিন্দু মন্দির ভাঙা হয়েছে। সেই ভাঙা মন্দিরের অনেকগুলিরই অবশেষও আজও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে গেলে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা হল—অধিকাংশ ইতিহাসবিদ চেপে গেছেন এই সত্যটা যে অসংখ্য মন্দির গড়ে দিয়েছে বা গড়তে সাহায্য করেছে মুসলিম শাসকরা—টাকাপয়সা জমি দান করে, করমুক্তি দিয়ে ও অন্যান্য ভাবে। অযোধ্যা সহ ভারতের যেখানে যত পুরনো মন্দির এখনও টিকে আছে, তার সবই ত্রয়োদশ শতাব্দ বা তারপরে নির্মিত হয়েছে। এমনকি যে অওরঙজেবকে আমাদের পাঠ্যপুস্তকে তীব্র হিন্দুবিদ্বেষী বলে চিত্রিত করা হয়ে থাকে, গোটা উত্তর এবং পূর্ব ভারতে তাঁরই দানে ও সহায়তায় অনেকগুলি মন্দির গড়ে উঠেছিল। [Pandey 1984, 41-56] অধ্যাপক যদুনাথ সরকার থেকে শুরু করে অধিকাংশ ইতিহাস লেখক তাঁর মন্দির ভাঙার কথাই শুধু প্রচার করে গেছেন, মন্দির গড়ে তোলার একটা ঘটনারও স্বীকৃতি দেননি। এই তথ্যও কোথাও পড়ানো হয় না যে টিপু সুলতান তাঁর অতি ক্ষুদ্র রাজ্যে অন্তত ১৫৬টি মন্দির হিন্দুদের জন্য তৈরি করে দিয়েছিলেন। [Ibid, 38]
৪) মন্দির ভাঙা, দেবমূর্তি চুরি ইত্যাদি ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে কোনটা ধর্মীয় বিদ্বেষের ঘটনা, আর কোনটা নিছক অর্থলোভ জনিত—তাও বিশ্লেষণ করে দেখা হয়নি। আমাদের ইতিহাস বইতে ধরেই নেওয়া হয়েছে, মুসলিম শাসকরা যখন হিন্দু মন্দির ভেঙেছে, তা ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রসূত। তার পেছনে আর কোনো কারণ থাকতে পারে না। অথচ, অওরঙজেব যে গোলকুণ্ডায় গিয়ে লুকিয়ে রাখা রাজস্ব আদায় করতে মসজিদও ভেঙে দিয়েছিলেন [Ibid, 51], সেই খবরটি ইতিহাস বইপত্রে থাকে না। এটাও কেউ ভেবে দেখেননি, নাদির শাহ গুজরাতের সোমনাথ মন্দির যে এগার বার আক্রমণ করেছিলেন, তা কিসের আশায়। নিছক ধর্মীয় বিদ্বেষে ভাঙতে হলে তো একবারই যথেষ্ট ছিল। আসলে সেই সব মন্দিরে রাজ্যের সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে বছর বছর যে কত সোনা মজুত করা হত, তার কি কখনও হিসাব করা হয়েছে? খোঁজ করা হয়েছে কি, এই অঢেল সম্পদ আসত কোত্থেকে এবং কীভাবে?
৫) ভারতবর্ষের বহু বড় বড় মন্দিরের ইট-পাথরের জাঁকজমক, স্থাপত্যের ঠাটবাটের তলায় চাপা পড়ে আছে এদেশের হাজার হাজার ইতিহাস-বর্জিত নারীর নীরব অশ্রু-রক্ত-কান্না। সেই সমস্ত নারী—যাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে জোর করে অথবা টাকাপয়সার লোভ দেখিয়ে তুলে এনে মন্দিরের দেবদাসী বানানো হত, তারপর চলত দেবতার নামে তারই ইহজাগতিক প্রতিনিধি পাণ্ডা পুরোহিত রাজা-জমিদারদের তরফে জীবনভর যৌন নির্যাতন। পুরুষতান্ত্রিক আধ্যাত্মিক পারমার্থিক মহান হিন্দু ধর্ম তখন আত্মপ্রকাশ করত সামাজিকভাবে শংসিত বা অনুমোদিত ধর্মীয় পুরুষতন্ত্র রূপে। শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর “দেনা-পাওনা” উপন্যাসে এই ধর্মীয় কদাচারের একটুখানি আভাস মাত্র দিতে পেরেছিলেন।
এমনকি, এই রকম একজন হিন্দু রমণী কচ্ছের রাণির উপর হিন্দু মন্দির সেবকদের হীন লাঞ্ছনার ঘটনাতে ক্রুদ্ধ হয়ে এবং সহযোগী হিন্দু রাজাদের অনুরোধেই যে অওরঙজেব কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের একটা অংশ ভেঙে ফেলার আদেশ দিয়ে দিয়েছিলেন [Ibid, 51; Sitaramayya 1946, 177-78], আমাদের ইতিহাসের পাঠ্য পুস্তকগুলি সেই সামান্য তথ্যটিও জানাতে ভুলে যায়। কাকে বাঁচাতে? সাধে কি আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কাশীতে বাবা-মাকে দেবদর্শন করাতে নিয়ে গিয়েও নিজে একটাও মন্দিরের দরজায় পা রাখতে রাজি হননি!
৬) ভারতবর্ষের সমস্ত হিন্দু মন্দিরে হিন্দুদের সংখ্যালঘু তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকেরা অর্থ ও প্রতিপত্তির জোরে সংখ্যাগুরু তথাকথিত নিম্নবর্ণের লোকেদের কখনও ঢুকতে দিত না, গ্রামের প্রধান রাস্তা দিয়ে চলতে দিত না, ভালো গভীর কুঁয়ো বা পুকুর থেকে জল তুলতে দিত না, অস্পৃশ্য বলে গ্রামের বাইরে সবচাইতে খারাপ জায়গায় বসবাস করতে বাধ্য করত [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৫/২৬২]—এই সব তথ্য কোনো ইতিহাস বইতে লেখা থাকে না। সমস্ত প্রাচীন পবিত্র হিন্দু ধর্মশাস্ত্র—বেদ উপনিষদ ব্রহ্মসূত্র স্মৃতিশাস্ত্র রামায়ণ মহাভারত গীতা—ইত্যাদিতে যে এই ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিভেদপ্রথার সপক্ষে নির্লজ্জ প্রচার চালানো হয়েছে, এই বর্বর প্রথা যে কোনো ভালো প্রথার পরবর্তীকালে বিকৃত রূপ নয়, আদিতেই সে এই জঘন্য বিভেদ-বিদ্বেষ সঙ্গে নিয়ে প্রচলিত হয়েছিল—কোনো ইতিহাস গ্রন্থ তা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের জানবার সুযোগ করে দেয়নি। তাদের পড়ানো ও শেখানো হয়—সমস্ত হিন্দুশাস্ত্রগুলি নাকি প্রথম থেকেই প্রেম ভক্তি বৈরাগ্য অহিংসা সহিষ্ণুতা সকল-নরে নারায়ণ-দর্শন আত্মা-পরমাত্মার মহামিলন এবং উচ্চতম আধ্যাত্মিক ভাবেরই একেবারে খাঁটি নলেন গুড়!
৭) আমাদের দেশে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দকে নিয়ে অনেক গর্ব করা হয়। অথচ যে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে রামকৃষ্ণ পূজার্চনা করেছেন, বিবেকানন্দের মতো শিষ্য সংগ্রহ করেছেন, সেই মন্দির একদিন হিন্দু মাতব্বররাই গড়তে সাংঘাতিক বাধা দিয়েছিল। জমিদাররা জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে চায়নি, ব্রাহ্মণরা সেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে বা সেখানে পূজা করতে যেতেও রাজি হয়নি। কেন না, মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী রাণি রাসমনি ছিলেন হিন্দু শাস্ত্রর মাপকাঠিতে শূদ্রাণি, জাতে কৈবর্ত। তাঁর নাকি মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকারই নেই। তাঁকে জমি কিনতে হয়েছিল একজন ইংরেজের কাছ থেকে, মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকার তিনি পেয়েছিলেন একজন ব্রাহ্মণকে মন্দিরস্বত্ব নিঃশর্তে দান করে। নেহাত গরিব না হলে গদাধর রামকৃষ্ণও হয়ত সেখানে পুজো করতে আসতেন না। পাঠ্যপুস্তকে, সহায়ক বইপত্রে, এমনকি রামকৃষ্ণ মিশনের বইপত্রেও দক্ষিণেশ্বর নিয়ে কত কাব্যভাব ভক্তিভাব ব্যক্ত হয়; কিন্তু হিন্দু ধর্মের মাতব্বরদের সেদিনকার এই কুৎসিত আচরণের তথ্যগুলি কেউ কোথাও লেখে না। বর্তমান প্রজন্মকে তারা এই সব সত্য জানতে দিতে চায় না।
৮) মোগল যুগে দক্ষিণ-পশ্চিম মারাঠা সাম্রাজ্য এবং উত্তর ভারতে শিখ শক্তির অভ্যুত্থানকে স্রেফ মুসলিম বাদশাহদের সাথে সংঘর্ষের কারণে প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। “জাতীয় গৌরব” হিসাবে চিত্রিত করা হয়ে থাকে। অথচ, বাংলাদেশে শিবাজি ও তাঁর প্রধান অনুচর ভাস্কর পণ্ডিতের বাহিনী বারবার এসে যে লুঠতরাজ চালাত, তাতে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল বর্গি ডাকাত হিসাবে। [রায় ১৯৮৯, ১১শ] আর এই দুই রাজশক্তি সম্পর্কে এমনকি বিবেকানন্দ পর্যন্ত বলেছিলেন, “মহারাষ্ট্র বা শিখ সাম্রাজ্যের উত্থানের প্রাক্কালে যে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াশীল। . . . মোগল দরবারেও তদানীন্তনকালে যে প্রতিভা ও বুদ্ধিদীপ্তির গৌরব ছিল, পুণার রাজদরবারে কিংবা লাহোরের রাজসভায় বৃথাই আমরা সেই দীপ্তির অনুসন্ধান করে থাকি। মানসিক উৎকর্ষের দিক থেকে এই যুগই ভারত-ইতিহাসের গাঢ়তম তমিস্রার যুগ এবং এই দুই ক্ষণপ্রভ সাম্রাজ্য ধর্মান্ধ গণ অভ্যুত্থানের প্রতিনিধি স্বরূপ ছিল, . . .।” [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৫/৩০৭]
৯) আকবরের সাথে রাণা প্রতাপের ও অওরেঙজেবের সঙ্গে শিবাজির যুদ্ধ ছিল বড় ও ছোট দুই সামন্তী শাসকের পারস্পরিক রাজ্য রক্ষা ও বিস্তারের সংঘর্ষ; অথচ সেগুলিকে আমাদের ইতিহাসের বইতে দেখানো হয়ে এসেছে বিদেশি বনাম জাতীয় শক্তির সংগ্রাম হিসাবে। আর এই বিদেশি মানে হল মুসলমান এবং জাতীয় মানে হল হিন্দু। অথচ দেশ জাতির ভারতীয়ত্ব-সূচক উপলব্ধি আমাদের ধারণায় এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দে, সিপাহি বিদ্রোহের সামান্য পরে। তার আগে পর্যন্ত দেশ মানে ছিল শুধুই নিজের গ্রাম; তার বাইরে গেলেই ভিন্দেশি, পরদেশি। বিদেশ-বিভুঁই। তাছাড়া, আকবর এবং অওরঙজেব—উভয়েরই সেনাবাহিনীতে একটা বড় অংশই ছিল হিন্দু। বস্তুত, মোগল সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল রাজপুত রাজাদের অধিকাংশের সমর্থন ও সাহায্য নিয়ে। একই ভাবে, রাণা প্রতাপ ও শিবাজির বাহিনীতেও অনেক সেনা এবং সেনাপতিই ছিল মুসলমান। এদের মধ্যে যুদ্ধ যা কিছু হয়েছে তা নিজ নিজ শাসনাধীন সামন্তী এলাকা রক্ষা ও বিস্তার নিয়ে। এর সাথে হিন্দু মুসলমানের কোনো সাম্প্রদায়িক বা অন্য কোনো ধরনের স্বার্থ জড়িত ছিল না।