BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

ভাস্কর্য বিরোধিতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের অল্পকিছু বাঙালি দোসর ছাড়া এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল সাম্প্রদায়িক চিন্তা আর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। দুঃখজনক যে, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির কাছাকাছি সময়ে দেশে আমরা দেখতে পাচ্ছি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর আস্ফালন। ১৯৭১ সালে সেই বাঙালিরাই গণহত্যা চালানো পাকিস্তানিদের দালালি করেছিল, যাদের মন ছিল ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন। যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে চায়, ধর্মের ভিত্তিতে যারা মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে, সেই গোষ্ঠীটি মুক্তিযুদ্ধের পর শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এরপর কখনো আমাদের রাজনীতিবিদদের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য, আবার কখনো রাজনীতিবিদদের সংকীর্ণ স্বার্থপূরণে নেওয়া পদক্ষেপের কারণে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী স্বাধীন বাংলাদেশে শক্তি অর্জন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সমর্থনকারী গোষ্ঠীর কতিপয় সদস্য স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় মন্ত্রীও হয়েছে। আজ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী প্রকাশ্যে চিৎকার করে ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যসহ অন্য ভাস্কর্যে আঘাত করে ক্ষতিও করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীসমূহ শক্তিশালী হতে পেরেছে বলেই।

‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরা এই বক্তব্যটি যেন বহু মানুষ বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সদস্যরা মনে গভীরভাবে ধারণ করে সেই চেষ্টা কি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের দেশে গত কয়েক দশকে করা হয়েছে? বরং আমরা দেখেছি, ধর্মান্ধরা তাদের সংকীর্ণ এবং অসহিষ্ণু বক্তব্য এবং দাবি-দাওয়া প্রকাশ করতে ধীরে ধীরে আরও সাহসী হয়েছে। মন ধর্মীয় গোঁড়ামি দ্বারা আচ্ছন্ন হলে ‘আমরা সবাই বাঙালি’ এমন অসাম্প্রদায়িক ভাবনার গুরুত্ব সেই মন বুঝবে না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ওয়াজে কিছু বক্তা অমুসলিমদের সম্পর্কে অত্যন্ত অবমাননাকর কথা বলেছেন। ওয়াজে প্রায়ই আপত্তিকর এবং অসম্মানজনক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে নারীদের সম্পর্কে, কখনো দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত যুক্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। এমন বক্তব্য দেওয়ার পরও প্রশাসন নির্লিপ্ত থাকার কারণে এ ধরনের বিদ্বেষমূলক এবং যুক্তিহীন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ওয়াজের ভিডিও আপলোড করা হলে দেখা গিয়েছে সেসব ভিডিও পছন্দ করেছে অনেকে।

স্বপ্নে করোনাভাইরাস এসে বলেছে তারা অমুসলিমদের ক্ষতি করবে, মুসলমানদের মধ্যে ভাইরাস ঢোকার কোনো রাস্তাই নেই, যারা পহেলা বৈশাখে নতুন পোশাক বানাবে তারা জাহান্নামি, বামপন্থিরা জাহান্নামে যাবে আর ডানপন্থিরা পাবে জান্নাত, যারা মুসলমান হয় না তারা চতুষ্পদ জন্তু থেকেও নিকৃষ্ট, নিশ্চয়ই নারীরা শয়তানের রূপ ধরে আসে, সারেগামাপাধানিসা মানে নারী-পুরুষকে মদ্যপ করে যৌনকর্মে লিপ্ত করা বিভিন্ন ওয়াজে দেওয়া এমন সব বক্তব্যের সঙ্গে ধর্মের কী সম্পর্ক? এমন অত্যন্ত অরুচিকর এবং অযৌক্তিক কথা ওয়াজে বলার মাধ্যমে কিছু বক্তা ধর্মের মর্যাদাই নষ্ট করেছে।

কিন্তু কেন বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ এ ধরনের বক্তব্যও শোনে এবং পছন্দ করে, সেই কারণ বিশ্লেষণ করা দরকার। অনেক বছর ধরেই দেশে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে চিন্তাশীল বই পড়ার চর্চা। পরিবারগুলোতে এখন ভালো বইয়ের সঙ্গে কমবয়সীদের পরিচয় ঘটে না। তার পরিবর্তে বিভিন্ন পরিবারে এখন টেলিভিশন চ্যানেলে অথবা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিনোদনমূলক উপাদান উপভোগের প্রবণতা বেশি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পুথিগত লেখাপড়া আর মুখস্থ বিদ্যার মাধ্যমেই ভালো ফল করছে ছাত্রছাত্রীরা! নানা বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন চাকচিক্যময় ভোগ্যপণ্য কেনার প্রলোভন তুলে ধরা হচ্ছে সর্বক্ষণ। এই পরিস্থিতিতে খুব কমসংখ্যক মানুষই সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র সম্পর্কে সুলিখিত বই পড়ছে। বিদ্যমান পরিবেশ বহু মানুষের মনে চিন্তাঋদ্ধ বই পড়ার এবং উঁচু মানের নাটক, চলচ্চিত্র দেখার আগ্রহ সৃষ্টি করছে না।

সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক (১৯৯১) ছবির একটি দৃশ্যের সংলাপের কথা মনে পড়ছে। মনোমোহন মিত্র (উৎপল দত্ত) স্পেনের আলতামিরা গুহার দেয়ালে আদিম যুগে আঁকা একটি বাইসনের ছবি প্রসঙ্গে বলছিলেন ‘আমি ঠিক করেছিলাম কলেজের পড়া শেষ করে আর্ট স্কুলে ভর্তি হব। এক দিন হলো কী, আমি তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, হাতে একটা বিদেশি পত্রিকা এলো। খুলে দেখি পাতা-জোড়া বাইসনের ছবি। ফোটো নয়, হাতে আঁকা। মাথার শিং বাগিয়ে চার্জ করছে। সে এক আশ্চর্য ছবি। এমন তেজ, এমন দৃপ্তভঙ্গি যেন দ্য ভিঞ্চিকে হার মানিয়ে দেয়। কে এঁকেছে এই ছবি? কে সেই অসামান্য শিল্পী? ছবির নিচে দেখি লেখা আছে যে আজ থেকে বিশ হাজার বছর আগে, প্রস্তর যুগে, স্পেনের আলতামিরা অঞ্চলে একজন আদিম গুহাবাসী এঁকেছিলেন এই ছবি। ব্যাপারটা এমনই অদ্ভুত যে, মনে মনে বললাম যে আমি জীবনে আর যাই হই না কেন, কিছুতেই আর্টিস্ট হব না। কারণ, দুনিয়ায় এমন কোনো আর্ট স্কুল নেই যা আমাকে এ রকম বাইসন আঁকতে শেখাতে পারে।’ শৈল্পিক সৃষ্টি তাই নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রস্তর যুগের গুহাবাসী আদিম মানুষদের মধ্যেও ছিল শৈল্পিক বোধ, যার ফলে তারা এঁকেছেন এমন অনন্য ছবি, যার রূপ এমনকি আধুনিক যুগের প্রখ্যাত শিল্পীদের ছবির থেকেও শক্তিশালী। কিন্তু যাদের মনে শুধুই থাকে যুক্তিহীন গোঁড়ামি আর সংকীর্ণ, বদ্ধচিন্তা তারা শিল্পের সুষমা আর সৌন্দর্য বুঝবে না। আধুনিক যুগে বসবাস করলেও মনের মূঢ়তার জন্য শৈল্পিক সৃষ্টি আর ঐতিহাসিক নিদর্শন তারা ধ্বংস করে দেবে।

চিন্তাশীল বই যারা কখনোই পড়ে না, কী করে তাদের মনে তৈরি হবে যুক্তিবোধ এবং বিচক্ষণতা? কীভাবে তারা বুঝবে যৌক্তিক চিন্তা এবং শৈল্পিক বোধ মনের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি? নিজ দেশের ইতিহাসই যারা জানে না তারা কী করে বুঝবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আদর্শ বলতে কী বোঝায় এবং কারা এ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিল এবং কারা হয়েছিল গণহত্যা চালানো এবং নারী ধর্ষণকারী পাকিস্তানিদের দোসর? আমাদের বুঝতে হবে যেহেতু বর্তমান সময়ে মননশীল বই না পড়ার কারণে বহু মানুষের মধ্যে চিন্তার গভীরতা নেই, তাই তাদের মন অন্ধচিন্তা এবং যুক্তিহীন ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হতেই পারে। যে তালেবানরা ২০০১ সালে তাদের নেতা মোল্লা ওমরের হুকুমের মধ্য আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় ষষ্ঠ শতকে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে তৈরি করা গৌতম বুদ্ধের দুটি প্রাচীন মূর্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল সারা বিশ্বের মানুষের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও, সেই তালেবানরা কি শিল্পকর্ম আর স্থাপত্যশৈলীর গুরুত্ব বুঝত? ঐতিহাসিক নিদর্শন আর ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝার মতো বিচক্ষণতা তো তাদের অন্ধচিন্তা-আচ্ছন্ন মনে ছিল না। এ কারণেই তারা এত প্রাচীন দুটি শিল্পকর্ম ধ্বংস করে দিতে পেরেছিল। আজ আমাদের দেশে যারা ধর্মের কথা বলে ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করছে, তাদের চিন্তা অবশ্যই সেই আফগান তালেবানদের মতোই।

যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে যারা অক্ষম, ধর্ম ব্যবহার করে যারা মানুষের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করে, তারা কখনোই সমাজের কল্যাণ করতে পারবে না। মানুষের মনে যুক্তিবোধ, মুক্তচিন্তা, এবং নান্দনিক অনুভূতি তৈরির পরিবর্তে তারা সৃষ্টি করে যুক্তিহীনতা আর কুসংস্কার, যার ফলে সমাজ হয়ে ওঠে অন্ধকার ও বিপজ্জনক। মনে রাখতে হবে, ১৯৭১ সালে ধর্মান্ধরাই ছিল আলবদরের সদস্য, যারা দেশের আলোকিত মানুষদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদের ধরে এনে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সদস্যরা ধর্মের কথা বললেও তারা অবলীলায় হত্যা করে নিরস্ত্র, নিরীহ মানুষদের। স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মান্ধ জঙ্গিরাও বিভিন্ন সময় নিরস্ত্র মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের এমন পৈশাচিক মনোভাবই প্রমাণ করে ধর্মের প্রকৃত অর্থ তারা বোঝে না।

দেশে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক হিসেবে গ্রিক পুরাণের দেবী থেমিসের যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল, ধর্মীয় গোঁড়ামি ধারণ করা গোষ্ঠী তা অপসারণের দাবি জানিয়েছিল। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে নাস্তিক্যবাদ ও হিন্দুত্বে¡র পাঠ দেওয়া হয়ে থাকে এমন অভিযোগ তুলে এই গোষ্ঠী পাঠ্যপুস্তক থেকে বেশ কিছু লেখা বাদ দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিল। মনে আন্তরিক বিশ্বাস রেখে যে ধর্মীয় আচার পালন করা হয়, তা তো কোনো ঠুনকো ব্যাপার নয় যে, পথে কোনো ভাস্কর্য থাকলেই ধর্মীয় আচার পালন বাধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু তখন এই গোষ্ঠীর বিভিন্ন দাবি যুক্তি দিয়ে বিচার না করে সেই দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়েছিল। এরা তাই আবারও বিভিন্ন দাবি জানাতে সাহসী হবে, তাই তো স্বাভাবিক। উগ্রচিন্তা ধারণকারীদের বিভিন্ন ছাড় দিয়ে শান্ত রাখার কৌশল সম্পর্কে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ‘উগ্রবাদী শক্তিকে ছাড় দেওয়ার অর্থ হলো খাওয়ানো হলে কুমির সহজে আক্রমণ করবে না এই আশা নিয়ে কুমিরকে খাওয়ানোর মতোই।’ অন্ধচিন্তার অনুসারীদের প্রশ্রয় দিলে তারা শক্তিশালী হবে এবং পরিস্থিতি নিরাপদ রাখার জন্য তাদের ছাড় দেওয়া হলে চার্চিলের মতে পরিস্থিতি প্রকৃত অর্থে হয়ে উঠবে আরও ভয়াল, বিপদ বাড়বে আরও। বর্তমানে ভাস্কর্যবিরোধিতার যে অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি আমরা দেখছি, তা তৈরি হয়েছে ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে তোয়াজ করার কারণেই।

অন্ধচিন্তার অনুসারীদের খুশি করার মাধ্যমে সমাজ থেকে ধর্মান্ধতা দূর করা যাবে না। আর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশে ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বিনা বাধায় দাপটের সঙ্গে যুক্তিহীন এবং অসহিষ্ণু দাবি এবং বক্তব্য তুলে ধরবে, তাও মেনে নেওয়া যায় না। ধর্মীয় অন্ধত্ব আর গোঁড়ামি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে খুব বেশি প্রয়োজন মানুষের মধ্যে যুক্তিবোধ আর চিন্তাশীলতা সৃষ্টি করা। কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করা নয়, মননশীল বিষয়বস্তু গ্রহণে মানুষকে অভ্যস্ত করে তুললেই মানুষ অর্জন করবে সুবিবেচনাবোধ এবং বুদ্ধির ঔজ্জ্বল্য। বুদ্ধিউজ্জ্বল এবং চিন্তাশীল মানুষ কেবল আলোকিত চিন্তাই গ্রহণ করবে এবং তখনই বিলীন হবে সব ধরনের অন্ধচিন্তা আর গোঁড়ামি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button