BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

মৌলবাদ বনাম মানবতাবাদ

মৌলবাদ মানে গোঁড়া সম্প্রদায়। ইংরেজি ফান্ডামেন্টালিজম শব্দের বাংলা অর্থ “মৌলবাদ” । ধর্মের আদি/মূল নীতি বা নিয়মগুলোর কঠোর অনুসরণই হল মৌলবাদ। এই ধারনাটির উৎপত্তি খ্রিস্টধর্মের প্রটেস্টান্ট থেকে। খ্রিস্টধর্মের ঊন-বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত নানা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়েছে এই মৌলবাদ নিয়ে। বাইবেলে যা লেখা আছে তা শুধু আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে মান্য করতে হবে, নাকি পরবর্তীতে সময়ের বাস্তব প্রেক্ষাপটে, মানব ইতিহাসের অগ্রগতির নিরিখে যুক্তি প্রয়োগ করে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পর মান্য করতে হবে? মৌলবাদীরা যা কিছু গ্রহণ করে থাকেন তা সাধারণত উদার ধর্মতত্ত্বের বিরুদ্ধে ।

আর এক অর্থে, যে ব্যক্তি বা সম্প্রদায় নিজের মতের প্রতি গোঁড়া এবং অন্যের মতের প্রতি এতোটুকুও সহনশীল নয় সেই ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ও মৌলবাদী। বর্তমানে মৌলবাদ শুধু গোঁড়া ধর্মীয় মতবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। এই মৌলবাদ এখন সার্বজনীন সকল মতবাদের মধ্যে লক্ষণীয়। যেমন- আস্তিক, নাস্তিক, আঞ্চলিক, রাজনৈতিক, জাতিগত, বর্ণবাদী, জেন্ডারবাদী ইত্যাদি এবং সর্বত্র।

ঈহুদি মৌলবাদীরা মনে করে তারা ঠিক, অন্যরা বেঠিক। খ্রিষ্টান মৌলবাদীরা মনে করে তাদের ধর্মের মত বা বাণী ব্যতীত অন্য সব অগ্রহণযোগ্য। হিন্দু মৌলবাদীরা মনে করে তাদের ধর্মের বাণী সনাতন বা আদি তাই অন্য সব অগ্রহণযোগ্য। মুসলিম মৌলবাদীরা মনে করে তাদের ধর্মের বানী আধুনিক অন্য সব বাতিলযোগ্য। ঠিক এমনি করে প্রত্যেক ধর্মের মৌলবাদীরা মনে করে তাদের নিজেদের ধর্মের মত বা বানী ব্যতীত অন্য সব তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য। যদি বিষটা এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলেও কোন কথা ছিল না। কিন্তু এক ধর্মের মৌলবাদীরা অন্য ধর্মের প্রতি কোন কালেই সহনশীল নয়, তার উপরে আবার সহিংস। শুধু অন্য ধর্ম কেন, নিজ ধর্মের উদার ধর্মতত্ত্ববাদীদের প্রতিও তারা সহনশীল নয়! বর্তমানে ইসলামী মৌলবাদীরা বিশ্বময় বিষফোঁড়া। তারপরে আছে বিষফোঁড়া ঈহুদী এবং হিন্দু মৌলবাদীরা। আর তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের জন্য।

এতো গেল আস্তিক মৌলবাদীদের কথা। এবার নাস্তিক মৌলবাদ। নাস্তিক মানে অবিশ্বাসী। যার ঈশ্বর বা আল্লাহর বা স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রতি কোন বিশ্বাস নাই, সেই নাস্তিক। একজন নাস্তিক মনেকরে সে মহাজ্ঞানী আর বাঁকিরা মহামূর্খ্য। সেই হিসাবে একজন নাস্তিক মানেই নীরব মৌলবাদের আর এক দৃশ্যমান রূপ। তবে নাস্তিক মৌলবাদীরা সহিংস নয়; তবে বিদ্বেষী। আর পৃথিবীতে আদতে অবিশ্বাসী বলে কেউ কি আছে? সবায় নিজেকে বিশ্বাস করে। নিজেকে বিশ্বাস করা মানেই ঈশ্বর বা আল্লাহ বা স্রষ্টাকে বিশ্বাস করা। তবে হ্যাঁ বিশ্বাস বা অবিশ্বাস এই সবের ঊর্ধ্বে আছে বদ্ধ পাগলেরা।

আঞ্চলিক মৌলবাদের বিষয় জানতে গেলে এবং বুঝতে গেলে রাজধানী ঢাকা শহরে বরিশাল এবং নোয়াখালীদের সবার আগে উদাহরণ হিসাবে আনা যেতে পারে। ঢাকা শহরে এই দুই অঞ্চলের বাসিন্দাদের চলা-ফেরা কথা-বার্তায় আচার-আচরণে আঞ্চলিক মৌলবাদের স্পষ্ট রূপ ফুটে ওঠে।

রাজনৈতিক তন্ত্রগত মৌলবাদ যেমন- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধনতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদির প্রভাবে বিশ্ব কয়টি ভাগে বিভক্ত। শুধু কি তন্ত্রগত মৌলবাদী! রাজনৈতিক দলগত মৌলবাদীও আছে। যেমন- বিভিন্ন মতাদর্শের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মৌলবাদীরা নিজের দলের নেতা কর্মী সমর্থক ব্যতীত, অন্য দলের নেতা কর্মী সমর্থকদের প্রতি সহনশীল নয় তো বটেই বরং অষহিষ্ণু। এই রকম রাজনৈতিক দলগত মৌলবাদীদের প্রভাবও বেশ লক্ষণীয়। আর তা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলিতে।

প্রাচীন কাল থেকেই জাতিগত মৌলবাদের প্রভাব দেখা যায়। বিশেষ করে আরব বিশ্বে বেশী। আরব, কুর্দি, তুর্কি, আর্মেনীয়, পার্সিয়ান ইত্যাদি জাতিগুলির মধ্যে হানাহানি আজও লক্ষণীয়। বর্তমানে ইরাক জাতিগত মৌলবাদেরই শিকার।

বর্ণবাদী মৌলবাদীদের প্রভাব আগে আফ্রিকাতে ছিল প্রকট ভাবে। বর্তমানে আমেরিকাতে বেশী লক্ষণীয়। বেশিভাগ শ্বেতাঙ্গ মানেই এক একজন মৌলবাদী, কৃশাঙ্গদের বিরুদ্ধে।

জেন্ডারবাদী মৌলবাদীরা লিঙ্গ বৈষম্যের প্রবর্তক এবং শোষক। বিশ্বময় এই লিঙ্গ মৌলবাদীতার শিকার সাধারণত নারীরা। তবে পুরুষও বটে। তৃতীয় বিশ্বের বিশেষ করে ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা পুরুষত্ব মৌলবাদীদের দ্বারা বেশী শোষিত হচ্ছে। আজও হিন্দু নারীরা তাদের পৈত্রিক সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

এই হিসাবে আমরা সবায় কোন না কোন দিক থেকে এক একজন মৌলবাদী বা মৌলবাদী মানসিকতার। তবে হ্যাঁ যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনায় কথা-কর্মে আচার-আচরণে অপরের প্রতি নমনীয় এবং সহনশীল থাকবো ততক্ষণ আমরা মৌলবাদী নয় বরং মানবতাবাদী। কিন্তু এর একটু এদিক-ওদিক যার ঘটবে সেই মৌলবাদী। তাই সব সময় সর্বস্থানে অন্যের প্রতি পারস্পরিক সহানুভূতিশীল নমনীয় উদার মানবিকতা সম্পূর্ণ এবং অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। সব কথার মূল কথা হিসাবে বলতে পারি; আমরা সবায় হয় মৌলবাদী নয়তো মানবতাবাদী।

আমাদের বিভিন্ন মৌলবাদী চেতনার পরিবর্তন ঘটিয়ে এবং মানবতাবাদী চেতনার সুদৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তবেই উন্নত নৈতিকতাবোধ সম্পূর্ণ মানবিক গুনের অধিকারী হতে পারবো। নতুবা মানব মুক্তি নাই। এর জন্য আগে নিজেদের মানসিকতার বা চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে। জয় হউক মানবতাবাদের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button