BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

ফান্ডামেন্টালিজম’ বা ‘মৌলবাদ’ শব্দটি অনেক সময় ভুল করে ‘ডগম্যাটিজম’ বা ‘গোঁড়ামি’-র সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

‘মৌলবাদ’ শব্দটির অর্থ
প্রথমেই খেয়াল করা দরকার, শব্দটি কিন্তু আমরা আমাদের কথাবার্তায় প্রায়শই ব্যবহার করি, এবং সব সময়ে ঠিক একই অর্থে নয়। এবং, এই ব্যবহারিক বিভিন্নতার ছাপ পড়েছে অভিধানেও। ইংরিজি অভিধানগুলোতে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ‘ফান্ডামেন্টালিজম’ কথাটার মূল অর্থ করা হয়েছে, ‘চিরাচরিত ধর্মীয় শাস্ত্রগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যা মেনে চলা, এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্বাস, রীতিনীতি, বাধানিষেধ ইত্যাদি কঠোরভাবে আঁকড়ে থাকা’ — বা ওই ধরনের কিছু। এবং, মৌলবাদীরা নিজেরাও তাঁদের অবস্থানের বিবরণ ও ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ঠিক ওই দাবিটাই করে থাকেন — তাঁরা কোনও এক বিশুদ্ধ ‘ফান্ডামেন্টাল’ বা মূল-কে আঁকড়ে ধরে থাকতে চান, অধার্মিক এই আধুনিক পৃথিবীর কুপ্ররোচনা ও কুপ্রলোভনে পা দিয়ে নিজেকে কলুষিত হতে দিতে চান না,বরং সম্ভব হলে দুনিয়াটাকেই ‘বিশুদ্ধ’ করে তুলতে চান (এটা বোঝা যায় যে, প্রবল সংরক্ষণশীলতা এর অপরিহার্য উপাদান, কিন্তু ‘মৌলবাদ’ মানে নিছক সংরক্ষণশীলতার বাড়াবাড়িটুকু মাত্র নয়)। কোনও কোনও অভিধান আবার এই বিষয়টিকে মূলত প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের ব্যাপার বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। বস্তুত, আমেরিকায় বিশ শতকের গোড়ায় একটি কট্টরপন্থী প্রোটেস্টান্ট গোষ্ঠীই কয়েকটি পুস্তিকা প্রকাশ করে প্রথম এই দাবিটি  তোলে, এবং এই ধরনের অর্থে ‘ফান্ডামেন্টালিজম’ শব্দটির ব্যবহারের সূচনা করে। তার পরে কিছুকাল পর্যন্ত ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ বা ‘মৌলবাদী’ বলতে শুধু তাদেরকেই বোঝাতো। কিন্তু বিশ শতক একটু গড়াতেই বোঝা যায়, প্রায় সমস্ত প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যেই ওই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এবং শব্দটি আরও ব্যাপক ও ‘জেনেরিক’ অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে। অর্থাৎ, সব ধর্মের কট্টরপন্থী জঙ্গিদেরকেই ‘মৌলবাদী’ বলে বোঝানো হতে থাকে। আবার, সাম্প্রতিক কালে ইসলামীয় জঙ্গিদের তরফে নাশকতামূলক কাজকর্ম অনেক বেড়ে যাওয়ায় কেউ কেউ ‘মৌলবাদ’ ব্যাপারটাকে শুধু ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ভাবতে চান, যদিও সেটা স্পষ্টতই ভুল (পরে আবার এ প্রসঙ্গে ফেরা যাবে)।

এবং কেনই বা হবেনা, সেটাও এখানে একবার বলে নেওয়া জরুরি। কারণ, তা না হলে বিভ্রান্তি ঘটতে পারে। আসলে, আমি চাইছিলাম ‘মৌলবাদ’ কথাটার ‘ফোক’ বা জনপ্রিয়  (এবং সেইহেতু ঢিলে) অর্থের সঙ্গে তার পারিভাষিক (এবং সেইহেতু ‘রিগোরস’ বা পরিশ্রমসাধ্যভাবে নির্মিত) অর্থের তফাতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, এবং সেইসূত্রে মৌলবাদ সম্পর্কে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। যথা — (১) মৌলবাদী উত্থানের বিভিন্ন দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে কোনও সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে কিনা, (২) একটি নির্দিষ্ট সময়কালে বিভিন্ন দেশ-জাতি-ধর্মের মধ্যে মৌলবাদী প্রবণতার উদ্ভব ও বিকাশের কোনও সাধারণ কারণ থাকতে পারে কিনা, (৩) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত উন্নতির পরেও, এবং মানবাধিকার-ধর্মনিরপেক্ষতা-গণতন্ত্রের ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত হবার পরেও, মৌলবাদের এই বিস্ময়কর উত্থানের পেছনে কোনও অনিবার্য কারণ ছিল কিনা, (৪) মৌলবাদ আসলে আধুনিক পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়ার জন্য ধর্মের তরফে শেষ চেষ্টা কিনা, (৫) একটি সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে ধর্মের আজ এ ছাড়া আদৌ কোনও ‘অপশন’ আছে কিনা, (৬) আধুনিক অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে মৌলবাদের জটিল সম্পর্কের টানাপোড়েনগুলোর কাঠামো ও প্রক্রিয়াগুলো ঠিক কী ধরনের, (৭) মৌলবাদ আদৌ ধর্মের বিলুপ্তি বিলম্বিত করতে পারবে অথবা আসলে তাকে ত্বরান্বিত করবে মাত্র। এইসব আর কি!   মৌলবাদ’ শব্দটির কোন কোন সম্ভাব্য অর্থকে এড়িয়ে চলতে চাই, তার তালিকা এবার পেশ করা যাক তবে। বলা বাহুল্য, ‘মৌলবাদ’ জিনিসটা আসলে কী বলে তবে আমার নিজের মনে হয়, তার ইঙ্গিত এখানে মাঝে মাঝেই চলে আসবে হয়ত বা, কোনও সচেতন আবাহন ছাড়াই ‘মৌলবাদ’ মানে নিছক মতান্ধতা বা গোঁড়ামি বা গা-জোয়ারি নয়, এ হল আধুনিক পৃথিবীতে ক্রমশ প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলতে থাকা ধর্মের তরফে জমি ফিরে পাবার জন্য এক মরিয়া লড়াই, হয়ত বা শেষ লড়াই।  ফলত, ‘রাজনৈতিক মৌলবাদ’, ‘বৈজ্ঞানিক মৌলবাদ’, ‘সেক্যুলার মৌলবাদ’, ‘নাস্তিক মৌলবাদ’ — ইত্যাদি কথার মধ্যে ‘মৌলবাদ’ শব্দটির প্রয়োগ নেহাতই ঢিলে প্রয়োগ, এবং বস্তুত অপপ্রয়োগ। এতে মৌলবাদের স্বরূপ প্রকাশ পায়না, বরং আরও চাপা পড়ে। বলা দরকার, সাধারণত ধর্মের হত্তাকত্তা আর উত্তর আধুনিকেরা এইসব লব্জ প্রয়োগ করে থাকেন। এবং, শব্দটির প্রয়োগ হয়ে থাকে ভিন্ন মতাবলম্বীকে গালি দেবার

‘ফান্ডামেন্টালিজম’ বা ‘মৌলবাদ’ শব্দটি অনেক সময় ভুল করে ‘ডগম্যাটিজম’ বা ‘গোঁড়ামি’-র সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেই ভুল অর্থে যুক্তিবাদী মুক্তমনা নাস্তিকরাও ‘মৌলবাদী’ (অর্থাৎ গোঁড়া বা মতান্ধ) হতেই পারে, অন্য অনেকের মতই। কারণ, কোনও মানুষই নিখুঁত নয়, আর নাস্তিক তো একজন মানুষই। গোঁড়ামি ছাড়িয়ে সত্যিকারের মুক্তমনস্ক হয়ে ওঠা এক দীর্ঘ ও কষ্টকর প্রক্রিয়া। কাজেই, কোনও এক বিশেষ মুহূর্তে কোনও একজন বিশেষ নাস্তিকের ক্ষেত্রে সে প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না-ই হতে পারে — হয়ত আমাদের অনেকেরই হয়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button