BlogComparative Religion AnalysisothersPolitical analysisUncategorized

মধ্য যুগের ভারতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ ছিলেন, পাশাপাশি বাস করেছেন, নিজের নিজের আচার বিশ্বাস পালন করে গেছেন

এই কারণেই আমরা যখনই যুক্তি দিয়ে তথ্য দিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে বিচার করি, তাতে শুধু হিন্দুত্ববাদীদের নয়, মুসলিম জঙ্গিদেরও গায়ে ফোস্কা পড়ে। বিপরীতভাবে আপনি যদি মুসলিম মৌলবাদকে যুক্তিপূর্ণভাবে বিচার করতে চান, আরএসএস পন্থীরা তাতেও বাধা দেবে। তারাও চেষ্টা করবে আপনাকে যুক্তির বাইরে টেনে নিয়ে যেতে। কিছু বাজে কূটতর্কে আপনাকে ফাঁসিয়ে দিতে চেষ্টা করবে।

এখানে একটা উদাহরণই সকলের চোখ খুলে দেবে। অনেকেই লক্ষ করেছেন, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলন যখন একাত্তরের ঘাতকদালালদের নির্মূল করার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, এই দেশের বামপন্থী মার্ক্সবাদী যুক্তিবাদীরা দু হাত তুলে বিপুল উৎসাহে তাকে সমর্থন জানিয়েছে, তার সাথে একাত্মতা জ্ঞাপন করেছে। সে তো ঘোষিতভাবেই ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মের এক বিশাল গণঅভ্যুত্থান। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান-ধারণার বিরুদ্ধে ভাষা-ভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাকে লালনের সপক্ষে এক বিশাল ঊর্মিমালা। কিন্তু এই দেশে শুধু ইসলামি সংগঠনগুলি নয়, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলিও তার সপক্ষে একটি বাক্যও ব্যয় করেনি। কেন? কেন না তারাও বোঝে, বাংলাদেশের জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন তার প্রকৃত অভিমুখ শেষ বিচারে তাদেরও বিরুদ্ধেই যাবে। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে ভাষার স্বাধিকারের দাবি, ধর্মের ভিত্তিতে নয় ভাষার ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের দাবি, যে তাদের “হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান”-এর বহু-উচ্চারিত একরেখ কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, এইটুকু বুদ্ধি তাদেরও আছে।

দু নম্বর কথা হচ্ছে, বিশ্ব-প্রেক্ষিতে ধরলে ইসলামি সন্ত্রাস যে একটা বিরাট সমস্যা—তা নিয়ে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই। বিশেষ করে মধ্য প্রাচ্যে, তালিবান, আল কায়দা, আইসিস, ইত্যাদি নানা নামের যে সমস্ত সংগঠনগুলি কাজ করছে তারা মানবতার পক্ষে এক ভয়াবহ বিপদ। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের সাপেক্ষেও, মুসলিম জনসংখ্যার বিপুলাধিক্যের কারণে ইসলামি সন্ত্রাসই সেসব দেশে মারাত্মক বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আবার হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদের কোনো গুরুত্বই নেই। কিন্তু আমরা যখন ভারতের প্রেক্ষিতে আলোচনা করছি, তখন দেখতে হবে, এই মুহূর্তে ভারতের সামাজিক রাজনৈতিক মঞ্চে বড় বিপদ কোত্থেকে আসছে? ইসলামি সন্ত্রাসই যদি দেশের সামনে বেশি শক্তি এবং মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হত, তাহলে তো এতদিনে যেখানে সে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় সেই কাশ্মীর থেকেই ভারতের পাততাড়ি গুটিয়ে চলে আসার কথা। বরং এখন পর্যন্ত তা যে ঘটেনি তাতেই বোঝা যায়, এই সন্ত্রাসের শক্তি এখনও বৃহত্তর বিপদ নয়।

কথাটা বোঝার জন্য আর একটা ছোট অথচ সহজদৃশ্য উদাহরণ দিচ্ছি। আগের ছয় বছরের অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি শাসন ভারতের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় কতগুলি মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে গেছে। জ্যোতিষ বাস্তুশাস্ত্র পৌরোহিত্য ইত্যাদি আদিম যুগীয় বর্জিত-বিদ্যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন তালিকায় তুলে দিয়ে গেছে। এবারকার দফায় তার তিন বছরের রাজত্বে সে মোদীর দক্ষ পরিচালনায় ইতিমধ্যে আরও বেশ কিছু বড় আকারের পরিবর্তন এনে ফেলেছে। প্রথমে উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী করে বসল এমন একজনকে যিনি বিদ্যালয়ের গণ্ডি কোনক্রমে পার করেছেন। স্মৃতি ইরানী—যার একমাত্র যোগ্যতা হল তিনি সঙ্ঘ পরিবারের একনিষ্ঠ সদস্য। তিনি আবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদে একের পর এক অযোগ্য লোকদের বসিয়ে দিয়েছেন সেই একই মাপকাঠিতে—শুধু মাত্র সঙ্ঘ পরিবারের কাছে আনুগত্যের কারণে ও প্রয়োজনে। পুনা জেএনইউ হায়দ্রাবাদ ইত্যাদি শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে স্রেফ দলীয় হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ জোর করে চাপাতে গিয়ে তারা এই সব জায়গায় আগুন জ্বালিয়েছে। হায়দ্রাবাদের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দলিত মেধাবী গবেষক ছাত্রকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে এরা। পুনার ফিল্ম ইন্সটিটিউতের মাথায় বসিয়েছে একজন তৃতীয় স্তরের সিনেমা কর্মীকে। তার বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ দমন করতে না পেরে পুলিশি সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে তাদের উপর। জেএনইউ-তে কয়েকজন ছাত্রকে ফেক ভিডিও তৈরি করে মিথ্যা দেশদ্রোহের মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়েছে। তাতেও সফল না হওয়ায় সেখানকার একজন ছাত্রকে গায়েব করে দিয়েছে। এবার ভেবে দেখুন, ইসলামি জঙ্গিদের হাতে যতই এ-কে ৪৭ ল্যান্ড মাইন আরডিএক্স ইত্যাদি থাকুক, তাদের পক্ষে ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থায় সিলেবাসে এবং/অথবা প্রশাসনিক কাঠামোয় এরকম একটা ছোট নুড়িও কি যোগবিয়োগের বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষমতা আছে? কাউকে বসানোর কাউকে হঠানোর ক্ষমতা আছে? একটা আঁচড়ও কি কাটার কোনো ক্ষমতা আছে? ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞান বা গণিত শিক্ষার পাঠক্রমে? গত ৭০ বছরে তারা কিছু করতে পারেনি; বিজেপি যা করে চলেছে, আগামী একশ বছরেও এরকম বড় মাত্রার ক্ষতি করার মতো জায়গায় তারা যেতে পারবে বলে মনে হয় না।
ফলে, এই বড় বিপদের বিরুদ্ধেই আমাদের সরব হতে হচ্ছে। যারা দেশের, দেশের শিক্ষা সংস্কৃতির অনেক বেশি—বলা ভালো আসল এবং কার্যকর—ভয়ঙ্কর ক্ষতি করে চলেছে এবং আরও ভয়ানক সর্বনাশ করতে চলেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আমাদের সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের সংজ্ঞা ও আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারেও দু-চার কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। মানসিক উপাদান হিসাবে দুটো কাছাকাছি হলেও ঠিক এক জিনিস নয়, কিন্তু গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং তাদের মধ্যে একটা গসাগু উপাদান হিসাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবীরূপে বিদ্যমান। আবার, ধর্মের সাথে এদের কিংবা এদের মধ্যে পারস্পরিকভাবে যে সম্পর্ক তাকে কোনোভাবেই ঠিক কারণ-কার্য সম্বন্ধরূপে অবধারণ করা সঠিক বিচার হবে না। অর্থাৎ, ধর্ম থাকলেই তার থেকে অনিবার্যভাবে সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদ আসবে, কিংবা কেউ সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা নিয়ে চলে মানেই সে মৌলবাদী, এমনটা সব সময় নাও হতে পারে। যদিও মৌলবাদী মানেই তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা পুরোদস্তুর বর্তমান। এই সব বহু-বর্ণ সম্পর্কগুলি সমাজ-মনস্তত্ত্ব হিসাবেও যেমন সত্য, আবার ব্যক্তিমানসের বিচারেও এই সব কথা মনে রাখতে হয়। তা না হলে বিচারে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

যেমন, মধ্য যুগের ভারতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ ছিলেন, পাশাপাশি বাস করেছেন, নিজের নিজের আচার বিশ্বাস পালন করে গেছেন। তাদের মধ্যে অনেক সময়ই ঝগড়াঝাঁটি মারপিট খুনোখুনি হয়েছে, কিন্তু তা কখনই সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত হয়নি। মেরুকরণ হয়ে যায়নি। অথবা, ঝগড়াঝাঁটির ছবিটাই সাধারণ সার্বক্ষণিক চলমান ছবি ছিল না। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঘটনাই ছিল প্রধান ও প্রলম্বিত বৈশিষ্ট্য (পরে আমরা এই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসব)। আবার, পরাধীন ভারতে মুসলিম লিগ একটি সাম্প্রদায়িক দল হিসাবে আবির্ভূত হলেও সেটা মৌলবাদী ছিল না। হলে আর জামায়াতে-ইসলাম জাতীয় মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের দরকার হত না। পক্ষান্তরে, আরএসএস প্রথম থেকেই অনেক বেশি মৌলবাদী, এবং সেই কারণেই বা তার অন্যতম আধারের সন্ধানেই সে সাম্প্রদায়িক।

ধর্মীয় বিশ্বাস আচার ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে একটা গোষ্ঠী যখন নিজেদের একটা বৃহত্তর (কাল্পনিক) ধর্মীয় স্বার্থবোধের দ্বারা তাড়িত ও চালিত হয়, সমাজ ও জীবনের অন্য সমস্ত স্বার্থবোধকে তার কাছে বিলুপ্ত বা গৌণ করে ফেলে, এবং এক (বা একাধিক) ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তার সেই স্বার্থ চরিতার্থতার পথে বাধা বা প্রতিবন্ধক বলে ভাবতে থাকে, তখন সেই গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে পড়ে। একাধিক ধর্মসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এবং চিহ্নিতকরণ সাম্প্রদায়িকতার এক অন্যতম প্রধান শর্ত। সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তার প্রধান লক্ষণ এবং অবলম্বন। এই শত্রুতা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটে কখনও কখনও দাঙ্গার মাধ্যমে, অস্ত্রের ঝনঝনানিতে, নৃশংস রক্তপাতে।

কিন্তু, মৌলবাদ তো শুধু এইটুকু নয়। সে প্রথমে তার নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেই শত্রু চিহ্নিত করে ফেলে। তারপর এবং তার ভিত্তিতে সে অন্যত্রও শত্রু খোঁজে। কেন না, শত্রু বেশি হলে তার সুবিধা হয়। তার লক্ষ্য তার ধর্মের আদিম যে বিশ্বাস প্রথা প্রকরণ আচার আচরণকে তারই সম্প্রদায়ের মানুষ ইতিহাসের লম্বা সরণিতে জীবনের স্বাভাবিক উজানে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে, সেইগুলিকে আবার ভাঁটিতে ফিরে গিয়ে খুঁজে খুঁজে তুলে আনা, অন্তত আনার কথা বলা, তার ভিত্তিতে আধুনিক জীবনচর্যাকে সর্বপ্রযত্নে বিরোধিতা করা। ফলে তার প্রথম এবং প্রধান শত্রু অন্য কোনো সম্প্রদায় নয়, তারই সম্প্রদায়ের যুক্তিবাদী সমাজপরিবর্তনকামী ইতিহাস-বিশ্বাসী মানুষ। তারপর তার লক্ষ্য তার ধর্মের আদিম বর্জিত উপাদানসমূহকে মানজাতির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক অর্জন হিসাবে দেখানো এবং প্রচার করা। সেই প্রয়োজনে তাকে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়কেও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে তুলতে হয়। এই অর্থে মৌলবাদী শক্তি একটা সমাজের পক্ষে আরও বড় বিপদ ডেকে আনে। তার শুধু সাময়িক ভিত্তিতে এলাকা ধরে ধরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করলে হয় না, এক সার্বক্ষণিক সাঙ্ঘর্ষিক জঙ্গি উত্তেজনাকে জাগিয়ে রাখতে হয় তাকে।

ভারতীয় উপমহাদেশের তিন টুকরোকে বিগত শতাব্দের ইতিহাসের দীর্ঘ মেয়াদে ভালো করে লক্ষ করলে এই সমস্ত উপলব্ধিগুলোকে মিলিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন শক্তিগুলিকে চিনতে পারা হয়ত একটু সহজ হবে।

[৪] হিন্দু মৌলবাদের জন্ম ও পুষ্টি

আমি এবার সরাসরি ভারতের সমস্যার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সঙ্ঘ পরিবারের যে মৌলবাদ তার জন্ম হল কীভাবে? সে তো আকাশ থেকে পড়েনি। এই দেশেরই সংস্কৃতির জল মাটি হাওয়ায় সে শ্বাস গ্রহণ করেছে, পরিপুষ্ট হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ লগ্নে, যখন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্ব দেশের বুকে প্রায় অবিসংবাদী রূপে প্রতিষ্ঠিত, অত্যন্ত জনপ্রিয়, জাতীয় কংগ্রেস যখন খুবই শক্তিশালী জনপ্রিয় সংগঠন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত, সেই সময়ে, উত্তাল জাতীয়তাবাদের লগ্নে, ১৯২৫ সালে, এরকম একটি উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী এবং দেশ ও জাতীয়তা বিরোধী সংগঠনের উৎপত্তি সম্ভব হল কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতে হবে। এর সুষ্ঠু মীমাংসা এখনও হয়নি।

সকলেই জানেন, সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শের মূল উপাদান দুটো। এক, প্রাচীন ভারতের সব কিছুই জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দুই, এই উপাদানগুলো সমস্তই নষ্ট হয়েছে মূলত মুসলমান রাজত্বের কালে। যা কিছু ওরা বলে, যত ফেনিয়েই বলে, যত খারাপভাবেই বলে, তার সবই হচ্ছে এই দুটো মৌল উপচারের ভাব সম্প্রসারণ। এর বাইরে আর অন্য কোনো কথা ওদের সিলেবাসে নেই।

কিন্তু এই উপচারগুলি ওরা কোথায় পেল? সঙ্ঘ পরিবারের তিন আদি গুরু—হেডগেবার, গোলওয়ালকর, সাভারকর—তাঁরাই কি এগুলোর আবিষ্কারক এবং প্রথম প্রবক্তা?

না। আমি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, আরএসএস প্রতিষ্ঠার অন্তত ছয় দশক আগে থেকেই এই চিন্তাগুলি ভারতীয় শিক্ষিত মননে ঘুরপাক খাচ্ছিল। মূলত শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত অগ্রসর বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, প্রমুখর লেখনী ও বাণীতে।
তাঁদের মাথাতেই বা এ জাতীয় চিন্তাভাবনা এল কোত্থেকে?

ইংরেজ শাসনের সূত্র ধরে। দুই বিভিন্ন পথে। এক বিচিত্র গ্রহণ ও বর্জনের প্রক্রিয়ায়। সেই জায়গাটা আমাদের প্রথমে বুঝে নিতে হবে। ভারত ইতিহাসের এ এক নির্মম রসিকতা।

ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজ প্রশাসকদের তরফে ভারতীয় সমাজ জীবন সংস্কৃতি ও সভ্যতা সম্পর্কে যে ঔপনিবেশিক তাচ্ছিল্য ঘৃণা অবজ্ঞার মনোভাব ব্যক্ত হত তার প্রতিক্রিয়ায় উনিশ শতকের একদল উচ্চশিক্ষিত ভারতীয় নিজেদের সম্পর্কে এক কাল্পনিক উচ্চশিখর প্রাচীন সভ্যতার জয়গানে মুখরিত হয়ে ওঠেন। বঙ্কিম চন্দ্রের “মা যা ছিলেন, . . .”, বিবেকানন্দের “হে ভারত ভুলিও না, . . .”, ইত্যাদি এই কল্পস্বর্গেরই উচ্চকিত আলাপন। এর থেকেই শুরু হয় বৈদিক জনজাতির লোকেদের সম্পর্কে এক আর্য-গরিমা কীর্তন। ঋগ-বেদ হয়ে ওঠে সর্বজ্ঞান সংগ্রহ এবং সর্বোচ্চ জ্ঞানের এক দৈব অপৌরুষেয় আকর। গঙ্গা-সিন্ধু অববাহিকার নিবিড় অরণ্য হয়ে ওঠে কোনো এক মনোরম তপোবন (প্রায় এখনকার অভয়ারণ্যের মতো)। সেকালের সমস্ত মানুষের জীবনে ফুটে উঠতে থাকে গণিতের ‘চার’ নামক সংখ্যাটির বিচিত্র রহস্যময় ক্রীড়াশীলতা—চতুর্বেদ, চতুর্বর্ণ, চতুরাশ্রম, চতুর্বর্গ, চতুর্যুগ, চতুর্মুখ, চতুরানন, ইত্যাদি। ধীরে ধীরে প্রাচীন ভারতে আধুনিক গণতন্ত্রের পার্লামেন্ট জাতীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিরও সাক্ষাত মেলে। তারপর ইউরোপ/আমেরিকায় যেমন যেমন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হতে থাকে, সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই সব কিছুই প্রায় খুঁজে পাওয়া যেতে থাকে বেদে, পুরাণে, উপনিষদে, তন্ত্রশাস্ত্রে, সাঙ্খ্য-বেদান্তে। সেই তালাশ আজও শেষ হয়নি।

এই মিথ্যা গর্বের অনুসন্ধান অনিবার্যভাবে একই সঙ্গে এক চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক মানসের জন্ম দেয়। যুক্তি ও তথ্যের বদলে বিশ্বাস এবং সংস্কারকেই জ্ঞান অর্জনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে ফেলে। কী জানা গেল সেটা নয়, কী জানলে সুবিধা হবে—তার ভিত্তিতে জ্ঞানচর্চা করার মন তৈরি করে দেয়। খোঁজার-আগেই-খুঁজে-পাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে গবেষণা।

এই অন্ধতার প্রভাবেই, ব্রিটিশদের প্রচারিত আর একটি মিথ্যাকে তাঁরা বিনা বিচারে সত্য বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যান। সিপাহি বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা শিক্ষা বিষয়ক সমস্যাগুলিকে গতানুগতিকভাবে দেখছিল। কিছুটা লেখাপড়া শিখিয়ে কাজ চালানো গোছের কিছু কেরানি তৈরি করার জন্য তারা এখানে ওখানে দু-দশটা স্কুল খুলছিল, তারপরে একটা-দুটো করে কলেজও খুলেছিল, এইভাবে চলছিল। ১৮৫৭ সালে প্রায় আধা-ভারত জোড়া সিপাহি বিদ্রোহ এবং তার সমর্থনে সীমিত আকারে হলেও এক ধরনের গণ অভ্যুত্থান তাদের আত্মবিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দেয়। তারা বুঝে যায়, শুধু সেপাই বরকন্দাজ দিয়ে ধমক-ধামক দিয়ে হয়ত আর বেশিদিন এই দেশে নির্বিঘ্নে ব্যবসাবাণিজ্য লুটপাট চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে এই সময় থেকেই তাদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে ভারতের জনমানসে একটা স্থায়ী ফাটল ধরিয়ে দেওয়া, যা তাদের জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে দেবে না। বা অন্তত জাতি গঠনের প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও বিলম্বিত করবে। ১৮৮০-র দশকে কয়েকজন ব্রিটিশ ইতিহাস লেখক ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুযুগ, মুসলিম যুগ ও আধুনিক যুগ—এইভাবে ভাগ করে ফেলেন। তারপর তাঁরা হিন্দুযুগকে খুব শান্তিপূর্ণ সংস্কৃতির বিকাশের কাল হিসাবে চিত্রিত করেন। আর মুসলমান যুগকে দেখান হিন্দুদের উপরে নিরবচ্ছিন্ন অত্যাচার নির্যাতনের এক লম্বা সিরিয়াল হিসাবে। তখন ধরে ধরে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, হিন্দুদের দেবদেবীর মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। [Grewal 1970; Hodiwala 1939; মুখোপাধ্যায় ২০০৩] এই কথাগুলিকে এ দেশের তদানীন্তন বুদ্ধিজীবীরা প্রায় বিনা বিচারে বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তাঁদের একবারও মনে হয়নি, এই রকম প্রচারের পেছনে ব্রিটিশ শাসকদের কোনো দুরভিসন্ধিমূলক স্বার্থ থাকতে পারে। তাঁরাও এই কথাগুলিকে তথ্য দিয়ে যাচাই করে দেখার চেষ্টা করেননি। আসলে এই বিচারশীল মনটাই তখন তাঁদের নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

প্রথম দিকের জাতীয়তাবাদী নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা ভারতের জনমানসে জাতীয় আবেগ দেশপ্রেম ইত্যাদি জাগিয়ে তোলার জন্য ব্রিটিশদের পরিবেশন করা ইতিহাস থেকে যে বীর-মূর্তি (hero-icon)–গুলি বেছে নিলেন তা হল রাণা প্রতাপ, ছত্রপতি শিবাজি, প্রমুখ। রাণা প্রতাপের লড়াই ছিল আকবর-এর সঙ্গে; শিবাজির ছিল অওরেঙজেব-এর সঙ্গে। ফলে জাতীয়তাবাদের আগমন-ধ্বনি রচিতই হল তথাকথিত এক নিরন্তর হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের কলরব দিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠের প্রথম সংস্করণে ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের কথা বললেও শাসকের ধমকে দ্বিতীয় সংস্করণেই বইটিকে আমূল বদলে ফেলে মুসলিম শাসকদের শত্রুস্থানে বসিয়ে দিলেন, ইংরেজদের দেখালেন হিন্দুর রক্ষাকর্তা হিসাবে। দেশ হয়ে গেল দেশমাতা, রূপকে মা দুর্গা। দেশকে ভালবাসার জন্য প্রথম যে সঙ্গীত (“বন্দে মাতরম”!) রচিত হল তা কোনো মুক্তি সংগ্রামের অভিযাত্রিক গীত হল না; তা হয়ে গেল দেশভক্তিগীতি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই শব্দবন্ধের নিষ্পন্ন কর্মধারয় সমাসে মধ্যপদটি কোনোদিনই আর লোপ পেল না। আজও হিন্দি ভাষায় দেশাত্মবোধক গানকে বলা হয় দেশভক্তিগীতি। স্কুল বসার প্রাক্কালে ছাত্রদের জাতীয় সঙ্গীত গাইবার নাম প্রার্থনা—প্রেয়ার। শপথ গহণ নয়। আজ অবধি। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মহারাষ্ট্রের শিবাজি-উৎসব এক বিপুল গরিমা লাভ করে; রমেশ চন্দ্র দত্তের উপন্যাসে, দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকেও রাজস্থানের রাজপুতদের এক মিথ্যা অবিচল দেশপ্রেম-কাহিনি রোমান্টিক কল্পবিলাসে দেশবাসীকে মগ্ন করে দেয়।

ইতিহাস-চেতনা ও সাংস্কৃতিক-বোধবুদ্ধির এই রকম ভ্রান্ত উপাদানগুলিই ভারতের এক বিরাট অংশের মানুষের মনে ধীরে ধীরে সঙ্ঘ-পরিবারের ধ্যান-ধারণার ভিত্তিভূমি রচনা করতে থাকে। তাই আমি মনে করি, ওদের গাল দেবার আগে, সমালোচনা করার আগে আমাদের এই দুর্বল ইতিহাসবোধ, এই মিথ্যা দেশপ্রেম-সন্ধানকে চিনে নিতে হবে।

এরপর চলে আসতে হবে আমাদের রাজনৈতিক বোধভূমিতে।

বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পৃষ্ঠভূমি রচনা করেছিল বললে খুব একটা ভুল বলা হয় না। সেই উপলব্ধি জাতীয় আন্দোলনকে প্রথম থেকেই এক খর্বিত চেতনায় প্লাবিত করে ফেলল। ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম সেই চেতনার আপ্লবে স্বাধীনতার যোদ্ধাদের অচেতনেই হয়ে পড়ল হিন্দুদের অভ্যুত্থান কার্যক্রম। যে সমস্ত ছোট ছোট বিপ্লবী গোষ্ঠী গড়ে উঠল বঙ্কিমী আনন্দমঠের সন্তানদের আদলে, কালী মন্দিরে রক্তশপথ নিয়ে যাদের সংগ্রামে যোগদান শুরু হয়, গীতা হয়ে গেল তাঁদের প্রেরণা-উৎস। বাল গঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিলেন শিবাজি উৎসব আর গণেশ পুজোর মাধ্যমে। এইভাবে সেদিন ভারতীয় রাজনীতি তার প্রাইমারি শিক্ষার স্তর পার করে মাধ্যমিক স্তরে এসে উপনীত হল। তার আষ্ঠেপৃষ্ঠে হিন্দুচেতনা; তার আগাগোড়া হিন্দুধর্মীয় পলেস্তারা। সে চায় এক অখণ্ড ভারতীয় জাতি; তার ভিত্তিতে সে রেখেছে শুধুই হিন্দু ধর্মীয় অনুষঙ্গ।

এর আর এক পরিণতি হল, হিন্দু ধর্মের বাধ্যতামূলক অঙ্গ জাতিভেদ প্রথা এই জাতীয় ঐক্যের দুর্বল প্রয়াসের মধ্যে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই জায়গা পেয়ে গেল। তথাকথিত উচ্চবর্ণের আধিপত্য যতটা বাস্তবে, তার চেয়ে অনেক বেশি আশঙ্কায়, এই আন্দোলনের শক্তিকে গ্রাস করে নিল, একে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেতে লাগল। স্বাধীনতা আন্দোলন শুধু হিন্দু্ধর্মাবলম্বীদের নয়, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রায় সোচ্চার চারণভূমি হয়ে উঠল। স্বয়ং তিলকের নেতৃত্বে এবং নির্দেশেই একটা সময় থেকে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে রাজনৈতিক সম্মেলনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কার সম্মেলন মঞ্চটি বন্ধ করে দেওয়া হল। তখনও কিন্তু আরএসএস নামক উপদ্রব এসে পৌঁছয়নি ভারতের রাজনীতির সক্রিয় রঙ্গমঞ্চে।

তার কিছুদিন পরই রাজনীতির ময়দানে আবির্ভাব ঘটল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button