মানবজাতির ইতিহাসে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কখনোই কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনি। বরং বিশ্বে যখনই কোনো সম্প্রদায় ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে, তখনই তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। ধর্মের নামে অনাচার, ধর্মকে অবলম্বন করে ফায়দা হাসিল, ধর্মের মর্মবাণীর অপব্যাখ্যা, ধর্মের প্রকৃত বিধানকে এড়িয়ে চলা, ধর্মের নামে গোঁড়ামি ও অন্ধত্ব, ধর্মের সহজ-সরল ও সাবলীল রূপকে রুক্ষভাবে উপস্থাপন, ধর্ম পালনের আড়ালে ধর্ম ব্যবসা এবং ধর্মের আশ্রয়ে অমানবিকতা আর অধর্মের চর্চার মাধ্যমে বিশ্বসমাজ থেকে বহু ধর্মের বিলুপ্তি ঘটেছে।
ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি হলে ধর্ম তার শাশ্বত ও চিরন্তন অবস্থানকে হারিয়ে ফেলে এবং মানবসমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা ও উপযোগিতা কমে যায়। পৃথিবীতে প্রবর্তিত সব ধর্মের একটি অভিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানবকল্যাণ। মানুষ ও মানবতার অকল্যাণ কোনো ধর্মেরই লক্ষ্য বা মূলনীতি হতে পারে না। ইতিহাসের একটি বড় দৃষ্টান্ত হলো- কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। ধর্ম নিয়ে ইতিহাসের শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষের কাজ হতে পারে না। বিষয়টি আমাদের সমাজ-সভ্যতার জন্য মারাত্মক কুফল বয়ে আনবে।
পৃথিবীতে ধর্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যুগে যুগে ধর্মের নামে বা ধর্মকে পুঁজি করে বাড়াবাড়ি হয়েছে। হজরত মুসা (আ.)-এর সময়ে তার অনুসারীদের মধ্য থেকে একটি অংশ চরম ধর্মীয় বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে তাদের কার্যক্রম ও পরিণতির ফিরিস্তি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। একইভাবে মহীয়সী মারইয়াম তনয় হজরত ঈসা (আ.)-এর সময়েও ধর্মীয় বাড়াবাড়ি কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। মহান আল্লাহ তার আপন ইচ্ছায় নবী ঈসা (আ.)-কে ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলনের মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটান। নবুয়ত ও রেসালতের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ প্রেরিত মহাপুরুষ হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সময়েও ধর্মীয় বিষয়াবলি নিয়ে একশ্রেণির মতলববাজ মানুষ বাড়াবাড়ি করেছে। এমনকি মহানবী (সা.) যেন কিছুদিন তাদের ধর্ম পালন করেন আর তারা কিছুদিন মহানবী (সা.)-এর ধর্ম পালন করবে সেই রকম সুবিধাবাদী প্রস্তাবও নিয়ে আসে। মহানবী (সা.) আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দেন- ‘লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়াদিন’ অর্থাৎ তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য আর আমাদের ধর্ম আমাদের জন্য (কুরায়শ-৬)।
রাসুল (সা.) অবিশ্বাসীদের সঙ্গে কোনো প্রকার বাদানুবাদে লিপ্ত হননি; তিনি বরং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী প্রজ্ঞার সঙ্গে কৌশলী আচরণের মাধ্যমে ধর্মীয় উসকানি ও সংঘাতকে এড়িয়ে গেছেন। কেননা মহানবী (সা.) যে মহান সত্তার ইবাদত-বন্দেগি করেন অবিশ্বাসীরা তার উপাসনা করে না, আবার অবিশ্বাসীরা যাদের উপাসনা করে মহানবী (সা.) তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন না; মহানবী (সা.)-এর উপাস্য সত্তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনাও হতে পারে না। তাই ধর্মীয় বিষয়ে মহানবী (সা.)-এর অবস্থান, মর্যাদা ও প্রকৃতি তাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন-ব্যতিক্রম। ধর্মের ব্যাপারে অন্যরা বাড়াবাড়ি করলেও মহানবী (সা.) ও তার অনুসারীদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। আর সে জন্যই আল্লাহতায়ালা নির্দেশ করেছেন- ‘লা ইক্রাহা ফিদ্দিন’ অর্থাৎ ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।
ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কুফল সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত ছিলেন আমাদের প্রিয় হজরত মোহাম্মদ (সা.)। আর তাই তিনি বিদায় হজের ঐতিহাসিক তাৎপর্যময় ভাষণে, সোয়া লক্ষ সাহাবায়ে কেরামের জনসমুদ্রে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন- ‘সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। এ বাড়াবাড়ির ফলে তোমাদের আগে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।’ ভাষণের শেষভাগে মহানবী (সা.) আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, তা হলো- ‘নিশ্চই জেনো, আমার পরে আর কোনো নবী নেই। যারা উপস্থিত তারা অনুপস্থিত সবার কাছে আমার এসব বাণী পৌঁছে দিও। হয়তোবা উপস্থিত কারোর চেয়ে অনুপস্থিত কেউ এ থেকে বেশি উপকার লাভ করবে।’
আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে মহানবী (সা.)-এর প্রদত্ত বিদায় হজের ভাষণের উল্লিখিত অংশে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। প্রথমত, মহানবী (সা.) সাবধানবাণী উচ্চারণের মাধ্যমে বক্তব্যটি শুরু করেছেন; তার মানে হলো অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় হলেই এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করা হয়। আর মহানবী (সা.) সাবধান শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করছেন এবং অত্যন্ত মনোসংযোগের মাধ্যমে তার বাণীর তাৎপর্য উপলব্ধির নির্দেশ দিচ্ছেন। সেই নির্দেশটি হচ্ছে- ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ধর্মের বাড়াবাড়ির কুফল সম্পর্কেও ইঙ্গিত করেছেন; সেটি হলো এর ফলে বহু জাতি-গোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতরাং তোমরাও যদি তাদের সেই একই পথে বিচরণ করো তাহলে তোমাদেরও ধ্বংস অনিবার্য। তারপরের যে বক্তব্যটি সেটি আমাদের ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ; সেটি হলো মহানবী (সা.)-এর পর আর কোনো নবী বা রাসুলের আগমন ঘটবে না। তাই সর্বশেষ নবী-রাসুল হিসেবে তার সুমহান বাণীর ওপরই আমাদের পরিপূর্ণ আস্থা, বিশ্বাস ও আমল করতে হবে।
Leave a Reply